আড়াই হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার

বাবর-রুবেল-বরকতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৯

আড়াই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে। সেই অর্থ পাচারের মামলায় ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা রুবেল-বরকতসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছে বিশেষ আদালত। একইসঙ্গে ফরিদপুর সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরসহ পলাতক ছয় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরুল কায়েশ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। একইসঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা তামিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৩ অক্টোবর দিন ধার্য রাখা হয়েছে। ঐদিন তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে জানাবেন পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করা না করার বিষয়টি। বাবর ছাড়াও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এ এইচ এম ফুয়াদ, যুবলীগ নেতা ফাহাদ বিন ওয়াজেদ ফাইন ওরফে ফাহিম, কামরুল হাসান ডেভিড ওরফে ডেভিড, মোহাম্মদ আলী মিনার ও মো. তারিকুল ইসলাম ওরফে নাসিম।

গত মার্চ মাসে বাবর-রুবেল-বরকতসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করে সিআইডি। ঐ চার্জশিটে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি পলাতক খোকন রাজাকারের আপন ভাগনে ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। তাদের খালু যুদ্ধাপরাধ মামলার আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বাচ্চু রাজাকার। স্বাধীনতাবিরোধী এমন পরিবারের ঘনিষ্ট স্বজন হওয়ার পরেও বরকত বাগিয়ে নেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। আর রুবেল ভাইয়ের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাংবাদিক না হয়েও জোর করে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতির পদ দখলে নেন। এরপর ফরিদপুর সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর ও যুবলীগ নেতা এ এইচ এম ফুয়াদের মাধ্যমে বলয় সৃষ্টি করে গত এক যুগ ফরিদপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে  উঠেন দুই ভাই। তাদের ইশারায় পুরো জেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। ক্ষমতার আশপাশে থেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেন তারা। এই পরিকল্পনায় সফল হওয়ার পরই তারা টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে সরকারের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে কমিশন নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান। তাদের এই কর্মকাণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর ও এ এইচ এম ফুয়াদ। এদের দুই জনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ও পরামর্শে সকল প্রকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি করে অবৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হন। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেন আসামিরা।

গতকাল এই অভিযোগপত্র গ্রহণের পূর্বে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় বরকত, রুবেল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আশিকুর রহমান ওরফে ফারহান ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খন্দকার নাজমুল ইসলাম লেভীকে। এর মধ্যে ফারহানের পক্ষে তার আইনজীবী জামিন চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ।

রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট তাপস কুমার পাল ইত্তেফাককে বলেন, ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নিয়ে অন্যদের অব্যাহতি দিয়েছে আদালত।

গত বছরের ২৬ জুন সিআইডির পরিদর্শক এস এম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ঢাকার কাফরুল থানায় বরকত ও তার ভাই রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ মামলায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বরকত ও রুবেলের মালিকানাধীন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেয় ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। ঐ জব্দের আদেশের মধ্যে রয়েছে, ৪৬৭টি দলিলের অধীনে ৫ হাজার ৭০৬ বিঘা জমি, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকসহ ৫৫টি গাড়ি এবং ১৮৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

দল পালটে অবৈধভাবে বাগিয়ে

নেন হাজার কোটি টাকা

চার্জশিটে বলা হয়েছে, আসামি সাজ্জাদ ও বরকতের আপন মামা মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি জাহিদুর রহমান ওরফে খোকন রাজাকার। এছাড়া ফরিদপুর জেলার সালতা থানাধীন বড়খারদিয়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার তাদের আপন খালু ও ফরিদপুর জেলা ফ্রিডম পার্টির একসময়ের ডাকসাইডের নেতা বাদশা মণ্ডল তাদের আপন চাচা। বরকত ও রুবেল ১৯৯৪ সালের ২৪ নভেম্বর ফরিদপুর জেলার বিএনপি নেতা চাঁন খন্দকারের ভাড়াটিয়া গুন্ডা হিসেবে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন খোকন হত্যা মামলার আসামি। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক ছিল। ২০০৮ সালের পূর্বে বরকত ও রুবেলের তেমন কোনো সম্পত্তি ছিল না। সাধারণ জীবন যাপন করত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি দল পালটে বরকত আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। পরে অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফরিদপুর জেলার রোডস, পিডব্লিউডি, এলজিডি, হেলথ, বিআরটিএ, পৌরসভা, বিদ্যুত্, জেলা পরিষদ, ফ্যাসিলিটিজ, সিএমএমইউ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, টেপাখোলা গরুর হাট, সিএন্ডবি ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সকল প্রকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও জেলা রেজিস্টার অফিসের দলিলসংক্রান্ত কমিশন বাণিজ্য করে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করে।

কেঁচে খুড়তে সাপ

গত বছরের ৭ জুন রাতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলার মামলার আসামি হিসেবে শহরের বদরপুরসহ বিভিন্ন মহল্লায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বরকত ও রুবেলসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। এ মামলার তদন্তে গিয়ে এ দুই ভাইয়ের ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের সন্ধান পায় সিআইডি। পরে এ মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়। নেওয়া হয় রিমান্ডে। রিমান্ডে থেকে পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা কীভাবে বিদেশে পাচার করেছেন এবং এর সুবিধাভোগী কারা তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন তারা। এছাড়া এসব অর্থ কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় অর্জন করেছেন তাদের নামও প্রকাশ করেন ঐ জবানবন্দিতে। ইতিমধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছে। এছাড়া চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রসহ বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।