শফিকুর রহমান রয়েল
সমৃদ্ধ অর্থনীতি, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি—এই তিন অভ্যন্তরীণ শক্তিতেই মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে প্রাণোচ্ছলতা বিরাজ করছে। তৈরি পোশাক শিল্পই বস্তুত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কোভিড-১৯-এর কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিম্নগতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এমন বিশ্বাস অটুট রয়েছে যে, আসছে বছরগুলোতেও এ খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃঢ় প্রদায়কের ভূমিকা বহাল রাখবে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দুই নম্বরে, সামনে আছে কেবল চীন। ১৯৭৮ সালে রপ্তানির জগতে প্রথম পা রাখলেও বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশই এ খাতের অধীনে এবং মোট জিডিপিতে যার অবদান ১২ শতাংশ। এটি ঠিক যে, গার্মেন্ট শিল্পের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। সেসব মাথায় রেখেই কাজের ক্ষেত্রের মানোন্নয়ন, শিল্পের নিরাপত্তা খাতে অনেক বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এরই সঙ্গে যৌক্তিক পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বেশ ভালোভাবেই ডিজিটাল লেনদেনকে সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চসংখ্যক শ্রমিকের জন্য ডিজিটাল বেতন প্রদান বিষয়টি নিশ্চিত করা একেবারে জরুরি হয়ে পড়েছিল।
ডিজিটালি বেতন লেনদেন সাধারণত শ্রমিকদেরকেই বেশি সাহায্য করছে, তা শুধু তাদের প্রাপ্ত বেতনের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাদিতে প্রবেশাধিকারের বেলায়ই নয়, তাদের সঠিক ও সময়মতো সম্মানী ও সুবিধাদি পাওয়াটা নিশ্চিত করতেও সহায়তা করে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ডসমূহের প্রতিনিধিবর্গ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বেটার ওয়ার্ক একত্রে বসে তৈরি পোশাক গার্মেন্টগুলোর ৯০ শতাংশ বেতন ২০২১ সাল নাগাদ ডিজিটালি প্রদান করাটা নিশ্চিত করতে এর পথে বাধাগুলো নিরসন করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ লক্ষ্যে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে হাস্যকর ও অপ্রত্যাশিতভাবে করোনা মহামারি সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যারা সবাই কি না জাতিসংঘভিত্তিক বেটার দ্যান ক্যাশ এ্যালায়েন্সের সদস্য। ২০০০ সালের জুলাই মাসে মহামারির চূড়ান্ত পর্যায়ে ৮৭ শতাংশ বেতন প্রদান হয়ে গিয়েছিল ডিজিটাল। ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের রপ্তানিভিত্তিক খাতসমূহ বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে চাকরি এবং শ্রমিকদের বেতন অব্যাহত রাখতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। সঠিক গ্রহীতার কাছে এই প্রণোদনার অর্থ পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করাটা জরুরি ছিল। আর সেজন্য ডিজিটাল লেনদেন হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে উপযুক্ত বিষয়। প্রণোদনা প্যাকেজের হিস্যা পেতে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে তাদের বেতন প্রদান পদ্ধতি ডিজিটায়িত করে সকলের মোবাইল অ্যাকাউন্ট সরকারের কাছে উপস্থাপন করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। সে উদ্দেশ্যে ঐ বছরের শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই খোলা হয়েছিল ১০ লাখ ৯২ হাজার মোবাইল অ্যাকাউন্ট। এটা সম্ভব হয়েছিল কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বব্যাপী দ্রুত অর্থ লেনদেনের ধারার অংশ হিসাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, বিশ্বের ১০০ কোটি লোকের কোভিড সম্পৃক্ত বেতন সুরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা সম্পৃক্ত হস্তান্তর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে।
নিয়োগদাতা ও শ্রমিকদের সংগঠনসমূহ নগদহীন বেতনের লেনদেন ও বেতন পদ্ধতির ডিজিটালায়নকে সাদরে গ্রহণ করেছে। আর করবেই বা না কেন, বেতনের সঙ্গে জড়িত মোট অর্থের পরিমাণের বাইরেও এর অনেক সুবিধা রয়েছে। ডিজিটাল বেতন লেনদেনের কারণে বেতন লেনদেনের সময় গার্মেন্ট কোম্পানিগুলো মানুষের মিথস্ক্রিয়া যথাসম্ভব কমিয়ে এনেছে। ডিজিটাল লেনদেন স্বাস্থ্যের সমস্যা চিহ্নিত করতে, যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনতে এবং বাজার ও কম ভিড়যুক্ত রাখতে সহায়তা করে। ডিজিটাল অর্থ গ্রহীতারা এর ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে ডিজিটাল উপায়ে অধিক ব্যয় করে, যেমন রেমিট্যান্স পাঠানো ও নানা পরিষেবার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে। এতে করে সঞ্চয় বৃদ্ধির পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক আঘাত সওয়ার সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণাপত্র জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশে গার্মেন্ট শ্রমিকদেরকে ডিজিটালরূপে বেতন প্রদানের কারণে ক্রমান্বয়ে তাদের হিসাব নম্বরের ব্যবহার, সঞ্চয় বৃদ্ধি ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। ডিজিটাল লেনদেনের কারণে কারখানার বেতন ও অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সময় সাশ্রয় হয় ৫৩ শতাংশ। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে দেশকে ডিজিটাল রূপান্তরে সরকারের প্রচেষ্টার কারণে, যার দরুন বাংলাদেশে আজ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটিরও বেশি। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ সম্প্রতি বাংলাদেশকে শ্রেণিবদ্ধ করেছে একটি ‘ব্রেক-আউট’ অর্থনীতি হিসেবে। তারা মতামত দিয়েছেন, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কোভিড-১৯-পরবর্তী উত্তরণের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন, লক্ষ্যসমূহ অভিমুখে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরণে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
—ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম অনুসরণে
