রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাঁসা-পিতল শিল্পে দুর্দিন!

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ২১:২৪

গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা

আধুনিকতার ছোঁয়ায় রাজশাহী, গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতলশিল্পে চলছে দুর্দিন। একটা সময় ছিল যখন বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিনের উপহার ও অতিথি আপ্যায়নে কাঁসা-পিতলের তৈরি উপহার সামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে কাঁসা-পিতলের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শান্তির মোড়ের কাঁসা-পিতলের পণ্য ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বিলেন, আগের মতো এ ব্যবসা আর নেই। আগে যেখানে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে এবং অন্যকে উপহার দিতে কাঁসা-পিতলের ব্যবহার করতেন, এখন তা একেবারেই কমে গেছে। যেখানে অর্ডার নিয়ে কাঁসা-পিতলের ব্যবসা পরিচালিত হতো এখন ক্রেতা এতই কমেছে যে, জিনিসপত্র প্রস্তুত করা থাকলেও কেউ নিতে আসেন না। তিনি আরো বলেন, এ ব্যবসা আমাদের বাপ-দাদারা করে গেছেন। তাই লোকসান হলেও বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আরেক ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, আগে রাজশাহীর বেশ কিছু স্থানে কাঁসা-পিতলের জিনিস তৈরির কারখানা ছিল। কিন্তু এখন রাজশাহীতে আর কারখানা দেখা যায় না। যার কারণে এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কাঁসা পণ্য কিনে এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে খরচ বেশি পড়ছে আবার বিক্রি না হওয়ায় নানাভাবে ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেলামাইন, প্লাস্টিক এবং কাঁচের তৈরি বাহারি ডিজাইনের জিনিসপত্র খুব কম দামে সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু কাঁসা-পিতলের  তৈরি জিনিসের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। আবার অনেকেই মনে করছেন, সহজে বহন সুবিধা, দামও হাতের নাগালে। আর কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এখন কাঁসা-পিতলের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী বাজারের কাঁসা ও পিতল ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, লোকজন ১০ বছর আগে চর অঞ্চল থেকে এসে আমার দোকান থেকে কাঁসা-পিতল যেভাবে কিনতেন বর্তমান সেভাবে বিক্রি নেই বললেই চলে। রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারে  মেলামাইনের জিনিসপত্র কিনতে আসা মাহফুজ খান জানান, কাঁসা-পিতলের  তৈরি জিনিসের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। এদিকে মেলামাইন আর স্টিলের  তৈরি জিনিস অনেক কম দামে পাওয়া যায়। আগে আমরা কাঁসার জগ ছাড়া পানি খাইনি। কিন্তু এখন প্লাস্টিকের জগেই পানি খাওয়া হয়। অপর ক্রেতা তাহমিনা রহমান জানান, কাঁসার তৈরি থালাতে আগে ছোট শিশুদের প্রথম মুখে ভাতের আয়োজন করা হতো। শিশুর বাড়ন্ত বয়সেও খাওয়ানোর জন্য এই থালাই ব্যবহার হতো। এখন এর বেশি প্রচলন নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে আজাইপুর, আরামবাগ, শংকরবাটিসহ ঐ এলাকার ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ এক সময় কাঁসাশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঐ এলাকায় তৈরি কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানসহ বিদেশেও রপ্তানি হতো। কিন্তু সুলভ ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের কারণে ধীরে ধীরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন যে কয়েটা কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলো ধুঁকে ধুঁকে চলছে। তিনি বলেন, জেলার ঐতিহ্য কাঁসা শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে এই খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকেও অর্থ সহায়তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।