বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন তাহার ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার’ উপন্যাসে দেখাইয়াছেন—রাজপুত্ররা কীভাবে তাহাদের রাজকীয় জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়েন, অ্যাডভেঞ্চার-পিপাসু হন এবং সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে যেই অচেনা অজানা এবং অনিশ্চয়তার বৈচিত্র্য রহিয়াছে—তাহার স্বাদ পাইতে চাহেন। কাহিনিটি ছিল ষোড়শ শতকের। পটভূমি ইংল্যান্ডের। রাজপুত্র এডওয়ার্ড ট্যুডো একদিন কৌতূহলবশত তাহার সমবয়সি ভিখারিপুত্র টম ক্যানটির সহিত পোশাক পরিবর্তন করিয়া ভিখারি হইয়া যায়। আর ভিখারিপুত্র হইয়া যায় রাজকুমার। তাহার পর অনভিপ্রেত চমক লইয়া আগাইয়া চলে কাহিনি।
বলা হয় মানুষের জীবন রূপকথার চাইতেও চমকপ্রদ। আমরা রোমিও-জুলিয়েট, লাইলি-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ কিংবা সেলিম-আনারকালির কাহিনি জানি। এই সকল কাহিনির মূল সুর হইল—ভালোবাসার পথ কখনো মসৃণ হয় না। আর তাহার সর্বশেষ রাজকীয় ঘটনা ঘটিয়াছে জাপানের রাজপরিবারে। জাপানের রাজকুমারী মাকো কয়েক বত্সর পূর্বেই ঘোষণা দিয়াছিলেন, তিনি অত্যন্ত সাধারণ ঘরের প্রেমিকপ্রবর কমুরোকে বিবাহ করিবেন। সম্প্রতি ইম্পেরিয়াল হাউজহোল্ড এজেন্সি জানাইয়াছে, আগামী ২৬ অক্টোবর তাহারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। ২০১২ সালে টোকিও আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তাহাদের দুই জনের প্রথম সাক্ষাত্ এবং ভালোলাগার সূত্রপাত হয়। রাজকুমারীকে বিবাহের মাধ্যমে অত্যন্ত সাধারণ ঘরের সন্তান কমুরোকে হয়তো ‘সাধারণত্ব’ হারাইতে হইবে, আর রাজকুমারী মাকোকে হারাইতে হইবে তাহার রাজকীয় ‘অসাধারণত্ব’। কারণ, প্রেমিককে বিবাহ করিতে গিয়া রাজকীয় মর্যাদা ত্যাগ করিতে হইবে রাজকুমারী মাকোকে। বিবাহের পর তাহারা সম্ভবত ঘর পাতিবেন আমেরিকায়।
রাজকুমারী মাকো জাপানের ক্রাউন প্রিন্সের মেয়ে এবং সম্রাট নারুহিতোর ভাতিজি। মাকোর বাবা ক্রাউন প্রিন্স আকিশিনো ইতিপূর্বে জানাইয়াছেন, মেয়ের বিবাহের ব্যাপারে তাহার আপত্তি নাই, তবে মাকোকে ইহার জন্য জনগণের সমর্থন আদায় করিয়া লইতে হইবে। কিন্তু মাকো রাজকীয় সকল ‘অসাধারণত্ব’ ত্যাগ করিয়া সাধারণের কাতারেই নামিয়া আসিতে চাহেন। এমনকি রাজপরিবারের বাহিরে কোনো রাজকুমারী বিবাহ করিলে রাজপরিবারের তরফ হইতে যেই এককালীন অর্থ দেওয়া হয় তাহা লইতেও অস্বীকৃতি জানাইয়াছেন ২৯ বত্সর বয়সি মাকো। এই জন্য অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিয়াছে—ইহা কি কেবল প্রবল ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ? নাকি আজন্ম রাজপ্রাসাদের বৈভব উপভোগ করিতে করিতে রাজকুমারীর মনে বৈরাগ্য আসিয়াছে? যদিও জাপানি রাজবংশের নিয়মে রাজদায়িত্ব শুধুই পুরুষের হাত হইতে যাইবে ভবিষ্যত্ পুরুষের হাতে। বংশের নারীরা রাজকুমারী হইতে কোনোদিন রানি হইতে পারিবেন না। রাজার মৃত্যুর পর রানির হাতে রাজদণ্ড যাইবে না। এবং রাজবংশের বাহিরে কাউকে বিবাহ করিলে তাহাকে রাজবংশও ছাড়িতে হয়। ইহার আগে রাজকুমারী মাকোর এক ফুপুও একইভাবে বিবাহ করিয়াছিলেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেকে। এই জন্য তাহাকেও ত্যাগ করিতে হইয়াছিল রাজবংশ।
রাজকুমারী মাকোর না-হয় সিংহাসনে ভাগীদার হইবার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু ব্রিটেনের প্রিন্স হ্যারি তো ছিলেন রাজসিংহাসনের দাবিদারদের একজন! কিন্তু তিনিও ‘অতি সাধারণ’ মেগানকে বিবাহ করিয়া একপর্যায়ে ত্যাগ করিতে বাধ্য হন রাজকীয় উপাধি ও দায়িত্ব। গত বত্সর প্রিন্স হ্যারি এবং তাহার স্ত্রী মেগান যৌথ বিবৃতিতে জানাইয়াছেন—তাহারা এখন হইতে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হইবার জন্য কাজ করিতে চাহেন। সুতরাং মার্ক টোয়েনের ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার’ কাহিনির মতো করিয়া বলা যায়, নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা অনন্ত দুঃখ—উভয়ের মধ্যে একটি মিল রহিয়াছে। ইহার কোনোটাই ভালো নহে। তাহা হইলে ভালো কোনটি? বৈচিত্র্য হইল এই জগতের অস্তিত্বের মূলে। সুতরাং বৈচিত্র্যের অভাব মানুষের জীবনের বাস্তুসংস্থানও দুর্বল হইয়া যায়, ঝিমাইয়া পড়ে। বৈচিত্র্যই এই জগতের চালিকাশক্তি, বৈচিত্র্যপিয়াসীদের নিকট বৈচিত্র্য বিহনে রাজপ্রাসাদও পানসে হইয়া যায়। অভিনন্দন রাজকুমারী মাকোকে, বৈচিত্র্যময় জীবন বাছিয়া লইবার জন্য।
