বরিশালের হীম নীড় পুকুরে এবার শ্বেতপদ্ম ফোটেনি

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ২২:৪০

শত বছরের বেশি সময় ধরে নগরীর রাজাবাহাদুর সড়কস্থ হীম নীড় চত্বরের পুকুরে দুর্লভ ‘শ্বেতপদ্ম’ (সাদা পদ্ম) ফুটলেও এ বছর পদ্ম ফুলের দেখা মিলছে না। গত বছর পুকুর পরিষ্কারের নামে দুর্লভ ‘শ্বেতপদ্ম’ কেটে বিলীন করার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রতি বছর এ সময়ে পদ্ম ফুলে পুরো পুকুর ভরে থাকলেও বর্তমানে শ্যাওলা আর আগাছায় ভরে গেছে। সামান্য কয়েকটি ফুল ফুটলেও সেগুলো সতেজ নয়। স্থানীয় প্রবীণরা জানান, ব্রিটিশ শাসনামলে নগরীর বান্দ রোড-সংলগ্ন সাড়ে পাঁচ একর জমি জুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তত্কালীন ম্যানেজার জার্মান নাগরিক ইলিগনর বিশেষ ব্যবস্থায় মাটির পাত্রে কিছু শ্বেতপদ্মের গাছ সংগ্রহ করে পুকুরের তলদেশে রোপণ করেন। এরপর পুরো পুকুর সাদা পদ্মে ছেয়ে যায়, যা থেকে পরবর্তীকালে পদ্মপুকুর নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানকার প্রায় ৮০ শতক জমির পুকুর জুড়ে সাদা পদ্ম থাকায় তা ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ দর্শনীয় এ স্থানটিতে প্রবেশে বিধিনিষেধ করলেও বাইরে থেকে লোকজন অপরূপ এই দৃশ্য দেখতে আসতেন। বিগত বছরগুলোতে প্রকৃতিপ্রেমীরা অপরূপ এই সৌন্দর্য উপভোগ করলেও এ বছর সেখানে সুনসান নীরবতা। এতে ভ্রমণপিপাসুরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

দর্শনার্থী ও এলাকাবাসী জানান, গত বছর পরিষ্কারের নামে পুকুরটির সব পদ্ম বিলীন করে দেওয়া হয়। তারা জানান, সে সময় যেভাবে পুকুরটি পরিষ্কার করা হয় তা অতীতে তারা দেখেননি। স্থানীয়সহ পরিবেশবাদীরা সে সময় এভাবে পুকুর পরিষ্কার করা পদ্ম ফুল বিলীনের ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। পরিবেশবাদীরা জানান, পদ্ম মূলত এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফুটে থাকে। গত বছর পদ্ম ফুলে ভরা পুকুরে সেপ্টেম্বর মাসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে তা কেটে বিলীন করা হয়। অথচ আরো দুই মাস ফুল ফুটত পারত। পুকুরটি পরিষ্কার করতে হলেও তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় করা উচিত ছিল। পুরো পুকুর পরিষ্কার না করে একাংশ রেখে দেওয়ার দাবিও জানানো হয় তখন।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা জানান, বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের হীম নীড় চত্বরের ‘শ্বেতপদ্ম’ পুকুর দেশব্যাপী ঐতিহ্য। একই জলাশয়ে এত সাদা পদ্ম ফুল বিরল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে তা কেটে ফেলায় এবার আর পদ্ম ফুল ফোটেনি। তিনি বলেন দীর্ঘ বছরেও কখনো এমনটা হয়নি। তাই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি। একই দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম জানান, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে সামাজিক আন্দোলনসহ নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. উজ্জ্বল হোসেন জানান, এ বছর পদ্ম ফুল না ফোটার পেছনে অনেক ভৌত ও জৈব বিষয় দায়ী হতে পারে, যা গত বছরের পুকুর পরিচ্ছন্নতার নামে পদ্মগাছ কেটে সাবাড় করার কারণে সৃষ্ট হয়েছে। ফলে মাটিতে বিদ্যমান কন্দ-পরবর্তী বছরের অঙ্কুরোদম, দৈহিক বৃদ্ধি ও ফুল ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে রাখার সুযোগ ও সময় পায়নি।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিআইডব্লিটিইএর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন অর রশিদ জানান, পদ্মর মৌসুম মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় প্রকৃতি সম্পর্কে খুব বেশি জানা নেই। তিনি আরো বলেন, ধান যেভাবে প্রতি বছর একভাবে জন্মায় না, সেখানে এ বিষয়টিও প্রকৃতির কারণে কম হতে পারে। পরিষ্কারের বিষয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, আগে যারা পরিষ্কার করেছে তিনিও সেসব লোকজন দিয়েই করিয়েছেন।