শিশুর ওপর অতিমারীর প্রভাব ও করণীয়

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ১৫:০৭

করোনা আতঙ্কের জেরে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে পড়াশোনা হয়েছে। অতিমারীর সংক্রমণ কিছুটা কমাতে এখন আবার অনেক দেশে স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সঙ্গে-সঙ্গে সতর্কতা মেনে  শিক্ষার্থীরা আবার ক্লাস করা শুরু করছে।

Fall 2020 Community Education Course Catalog - Waukee Community School  District

প্রায় দেড় বছর পর আমাদের দেশে স্কুল খুলেছে। আমার-আপনার কাছে ব্যাপারটা যতো সাধারণ, বাচ্চাদের কাছে ঠিক ততোটাই জটিল। তাই তাদেরকে এই নতুন জীবনে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট সাহায্য আমাদেরকেই করতে হবে। শিশু ও কিশোরদের প্রতি এটি মা-বাবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

স্কুল খোলার পর বাচ্চারা একরকম নতুন করে জীবন শুরু করছে। সিদ্দিকি’স ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারপার্সন রিফাত আহমেদ বলেন, ‘‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর এটা পুরো সমাজের একধরনের পুনর্জন্মের মতো। দেড় বছর বাচ্চারা স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে দূরে নিজের ঘরে বন্দী জীবনযাপন করেছে। এই সময়ে তো তার স্বাভাবিক সামাজিক দক্ষতাটুকুই তৈরী হতে পারে নি। বিষয়টা খুবই সংবেদনশীল এবং এটা বুঝতে হবে শিক্ষক ও পরিবারকে।

No description available.

রিফাত আহমেদ

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা দুটোই অনেক বেশি ত্রুটিপূর্ণ। আমার মনে হয়, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নামমাত্র এগুচ্ছে। সারা পৃথিবীর সাথে যদি তুলনা করা হয়, ভীষণ পিছিয়ে আছি কিন্তু আমরা। আমি সবচেয়ে বেশি যে শিক্ষা উপকরণটির অভাব অনুভব করি এখন, সেটি হচ্ছে ‘খেলার মাঠ’। আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী। আমরা সবসময়ই জেনেছি ‘খেলা’-ই হবে শিক্ষার মাধ্যম। ‘প্লে থেরাপী’ বলা হয় একে। কেননা খেলা শিশুকে উজ্জীবিত করে, এর মাধ্যমে ভাষার বিকাশ হয়, গল্প বলা শেখে, জীবনে নিজেই ঝুঁকি নিতে শেখে, নেতৃত্ব দিতে শেখে, সামাজিক সম্পর্কগুলোকে তৈরী করতে শেখে। বর্তমানের শিশুরা তো এমনিতেই চার দেয়ালের মধ্যে থেকে তাদের এই গুণগুলোকে বিকশিত করতে পারছে না, তার উপর যোগ হয়েছে করোনাকালীন লকডাউনে ঘরবন্দী জীবনযাপনের বিষক্রিয়া।’’

School reopening in Bangladesh: Children at greater risk in Delta-hit areas

তিনি আরো বলেন, ‘‘শিশু-কিশোররা ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। শিশুর বেড়ে ওঠার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াতেই হরমোনের পরিবর্তন ঘটে চলে, যে কারণে আবেগকে তারা আরো জোরালোভাবে অনুভব করে। সামান্য জিনিসকেও খুব বড় করে দেখে তারা। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের যে মানসিক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে, তা কোনোভাবেই হালকা করে দেখা যাবে না। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার পরিবারের সমর্থন। আমরা বার বার ভুলে যাই যে, ভালো গ্রেডের জন্য বাচ্চাকে চাপ প্রয়োগ কিংবা অন্য একটি বাচ্চার সাথে ক্রমাগত তুলনা করার মাধ্যমে তাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটাকে আমরা ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছি।’’ 

Social Distancing Challenges for Kids and How to Help | Understood - For  learning and thinking differences

এসময় শিশুকে বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। এই দায়িত্ব বাবা-মায়ের ও স্কুলের। একটি তিন বছরের শিশুকেও গল্পের বই পড়ে শোনানো উচিৎ। বেডটাইম রিডিং বলে একটা কথা আছে। মা-বাবাকে কষ্ট করতে হবে। প্রতি মাসে ২টি করে বই পড়ে শোনালে বছরে ২৪টি বইয়ের সাথে শিশুর পরিচয় হয়ে যায়। সারা বিশ্ব এভাবেই তার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। সেই সাথে স্কুলগুলোতে স্টোরি-টেলিং ক্লাস বাড়াতে হবে। স্টোরি-টেলিং মানে শুধু গল্প বলা নয়; এর মাধ্যমে তাকে সমাজ-সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দেয়া সম্ভব হয়।

রিফাত আহমেদের মতে, ‘‘শিক্ষকদেরকেও ভীষণ সচেতন হতে হবে। কোনো কোনো সময় শিক্ষকের সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ বা আচরণ শিশু-কিশোরদের মনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির জন্য দায়ী। পুরনো পৃথিবীর এই নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্করাই যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে একজন উঠতি বয়সের শিশু বা কিশোরের অবস্থা কেমন হতে পারে, সেটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। তারা বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আর তাকে এই চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত আমাদেরকেই করতে হবে। আমাদেরকেই হতে হবে আমাদের সন্তানদের শক্তি। তাই সময় এসেছে নিজেদেরকেও প্রস্তুত করবার, সন্তানের ঢাল হয়ে তার সামনে দাঁড়ানোর ও পিছলে যাওয়ার আগেই তাকে আগলে ধরবার শক্তি সঞ্চয়ের।’’

ইত্তেফাক/এফএস