মৌসুমি লেখকের উপস্থিতি পেশাদারিত্বে প্রতিবন্ধকতা

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩১

বই নিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মেলার আয়োজনের গর্বটা একমাত্র বাংলাদেশের। শুধু লেখক-প্রকাশক-পাঠকের জন্য এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সংস্কৃতির জন্য সমানভাবে অর্থপূর্ণ। বই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেও একুশে গ্রন্থমেলার বিকল্প নেই। তবে প্রকাশের সংখ্যা দিয়ে সত্যিকারের পাঠক সম্পর্কে  যেমন নিশ্চিত হওয়া যায়না, তেমনি পরিধির বিস্তৃতি, অধিক বিক্রির হিসেব দিয়ে,  গ্রন্থ মেলার সাফল্য সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। মেলায় প্রকাশিত অসংখ্য বই থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়া জরুরী কেননা সেখান থেকেই তৈরি হবে পাঠকের রুচি ও পেশাদারি লেখক। প্রকাশের সংখ্যাধিক্যের ফলে এসব ক্ষেত্রে হিতে বিপরীতের আশঙ্কায়,   সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বই বাণিজ্য পণ্যে রূপান্তর হচ্ছে এটা আনন্দের খবর। তবে লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক এখনো যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারেনি এর পেছনেও দায়ি প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি সময়ে বিপুল পরিমাণ বই প্রকাশের ইতিহাস। এসময়ে মৌসুমি লেখক তৈরি হওয়ার ফলটা আতঙ্কিত করে তোলে পরিশ্রমী লেখকদের। মৌসুমি লেখকদের ভাবনা ও আচরণ প্রকাশকদের মনে অ-পেশাদারী মনোভাব তৈরির সুযোগ তৈরি করে। এর ভুক্তভোগী হন অন্য লেখকরা। অন্তর্জাল,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অসংখ্য লেখক তৈরি হচ্ছেন, এই প্রবাহে ঠাঁই পেয়ে যায় অ-সম্পাদিত, গুরুত্বহীন এবং দুর্বল লেখার বই। বিজ্ঞাপনের প্রভাবে পাঠকের আগ্রহ তৈরি করে সে সব গ্রন্থ। বই বিক্রির সংখ্যাটা যে পাঠককে প্রভাবিত করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সংখ্যাধিক্যের আরেকটি ক্ষতির দিক, প্রচারণায় পুরনো ভালো বইয়ের ঠাঁই না হওয়া। বিগত মেলায় প্রকাশিত ‘অসাধারণ উপন্যাস’ আর এ মেলায় ডিসপ্লেতে নেই ফলে এক বছর পরই প্রমাণ হচ্ছে ওটা আদতে ‘অসাধারণ’ ছিল না। এবারের বই মেলায় তাই সে বিশেষণের বিভ্রমে সত্যিকার ‘অসাধারণ’ বইটি হারিয়ে যাচ্ছে যা হয়ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে কোন মূল্যেই। অনুবাদ গ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে অনুবাদকদের কাজের কোন জবাবদিহিতা নেই, ধারাবাহিকতা নিয়েও তাঁরা অনুবাদের সুযোগ পান না।

তবে এত সব প্রতিকূলতার পরও আমাদের ভালোবাসার জায়গা, প্রাণের টান বই মেলা। মেলার ধূলো পায়ে বাড়ি ফিরেও আনন্দের রঙ পায় পাঠক, লেখক। জীবনের প্রথম বই হাতে নেওয়া তরুণ লেখকের বিস্মিত চোখ ধরা পড়ে স্বালোকচিত্রে, অটোগ্রাফ দিতে কেঁপে যাওয়া হাতের কলম  ফেরত যায় না পকেটে, পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যায় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এক পাশে প্রতি বই মেলার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিরীষ গাছের তলায়, হুইল চেয়ারে বসে বইয়ের পাতা উল্টে যাওয়া পাঠক ধরা পড়েন আলোকচিত্রির কাছে, রাজধানীর অন্য প্রান্ত থেকে আসা কিশোরির ফুলের মুকুটের তলায় থাকা এক জোড়া উত্সুক চোখও কি এই গ্রন্থ মেলার সম্পদ নয়?

বাংলা ভাষাতেই যে সৃজনের জোয়ার এসেছিল সে ইতিহাস ফিরে আসে গ্রন্থ মেলাকে কেন্দ্র করেই।  নানা শ্রেণির বই থেকেই বেরিয়ে আসে পাঠকের মনে রাখার মতো অমূল্য ভাবনা। তৈরি হয় নতুন লেখক। সময় যদিও অমূল্য তবুও লিখতে লিখতে, পড়তে পড়তেই তৈরি হয় রুচি। পুরনো মূল্যবান লেখার সঙ্কলনের চেষ্টা,  কোন কোন প্রকাশনীর লেখক সম্মানী দেওয়ার প্রচেষ্টা, তরুণ লেখকের আরো একটু যত্ম নিয়ে লিখতে না পারার মনস্তাপ এসবই আশাজাগানিয়া। এই প্রত্যাশাই একটি বছর আমাদের অপেক্ষা করায়, আগামী গ্রন্থ মেলার জন্য।

লেখক ও সাংবাদিক