রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হওয়া মাস্টার মুহিবুল্লাহকে (৫০) হত্যায় নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে উগ্রবাদী রোহিঙ্গা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে সশস্ত্র এ গোষ্ঠীর মুখপাত্র মৌলভি শোয়েব এ দাবি করে বলেছেন, ‘মিয়ানমার সরকারের এজেন্টরাই মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত।’ এদিকে এ হত্যার ঘটনায় আরো দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে ২৭টি আন্তর্জাতিক সংগঠন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা জানিয়েছেন।
আরসার বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে
বৃহস্পতি ও শুক্রবার আরসার কমান্ডার ইন চিফের পক্ষে অডিও এবং লিখিত দুটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এক বিবৃতিতে মৌলভি শোয়েব বলেন, ‘এ খুনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং এটা একে অপরকে ভিত্তিহীনভাবে দোষারোপের সময় নয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরসা কোনোভাবেই জড়িত নয়।’ অডিও বার্তায় আরসার পক্ষে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ভাই মাস্টার মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজ করছিলেন। পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রচেষ্টা ছিল অসাধারণ। এমন একজন রোহিঙ্গা নেতাকে হত্যা রোহিঙ্গা জাতির জন্য বড় ক্ষতি।’ তিনি বলেন, ‘এর আগেও মে মাসে আরেক রোহিঙ্গা নেতা শওকত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ দুই নেতার হত্যা নিয়ে আরসা অত্যন্ত মর্মাহত ও ব্যথিত।’ অন্যদিকে আরসা কমান্ডার ইন চিফ আবু আম্মদ জুনুনী লিখিত বিবৃতিতে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গের সামনে নিহতের ভাই হাবিবুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যার পেছনে আরসার সন্ত্রাসীরা জড়িত। কিন্তু ঐদিন রাতে উখিয়া থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারে কাউকে আসামি না করে কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রুপের কথা বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি
বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর হত্যাকারীদের অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করা হবে। মুহিবুল্লাহ নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যেতে চেয়েছিলেন। সে কারণে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাকে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা ইতিমধ্যে মুহিবুল্লাহ হত্যার বিচার দাবি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আরো ২ জন গ্রেফতার
ঐ হত্যার ঘটনায় শনিবার ভোররাতে এপিবিএনের একটি টিম উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে ১ ইস্ট লম্বাশিয়া ক্যাম্প থেকে আব্দুস সালাম (৩০) এবং ৮ ইস্ট কুতুপালং ক্যাম্প থেকে জিয়াউর রহমান (৩২) নামে দুই জনকে আটক করেছে। এর আগে শুক্রবার সেলিম উল্লাহ ওরফে লম্বা সেলিম (২৭) নামে আরো একজনকে আটক করেছিল তারা। পরে তাদের সবাইকে উখিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক পুলিশ সুপার মো. নাইমুল হক। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমেদ সনজুর মোরশেদ গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি ২৭ আন্তর্জাতিক সংগঠনের
মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ২৭টি আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সংগঠন। যৌথ বিবৃতিতে এ ঘটনায় ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি আরো নাজুক ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলোর কর্তা ব্যক্তিরা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে—আরাকান রোহিঙ্গা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন-অস্ট্রেলিয়া, আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এআরএনও), অস্ট্রেলিয়ান বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন, ব্রিটিশ রোহিঙ্গা কমিউনিটি ইন ইউকে, বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন-জাপান, কানাডিয়ান বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন, ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল (ইআরসি), রোহিঙ্গা অ্যাকশন আয়ারল্যান্ড, রোহিঙ্গা আমেরিকান সোসাইটি এবং রোহিঙ্গা সোসাইটি মালয়েশিয়া।
উল্লেখ্য, বুধবার রাতে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করে। বৃহস্পতিবার রাতে হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এরপর থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের টহল বাড়ানো হয়েছে।
