রেজাউল হক কৌশিক
কর্পোরেট হাউজগুলোতে নারী কর্মীরাই এখন মূল শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছে কর্পোরেট হাউজগুলো। ফলে, শহরে তো বটেই তৃণমূলেও অফিস, আদালত ও ব্যবসায় নারীরা প্রাধান্য পাচ্ছেন। নারীদের এভাবে উঠে আসার প্রধান কারণ হিসেবে সমাজবিদরা বলছেন, মেয়েরা অফিসে প্রতিযোগিতামূলক কাজে ভালো করছে। জীবনের শুরু থেকেই ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেড়ে উঠতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠাই এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। অন্যান্য কর্পোরেট অফিসের মতো ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ার থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জায়গাতেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে নারীদের।
তানিয়া পলি। চাকরি করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। তিনি বলেন, নারীদের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেই চাকরি করতে হয়। ব্যাংকের চাকরিও এর বাইরে নয়। চাকরি পাওয়া থেকে শুরু করে নিত্যদিনের কাজে নারীদের যোগ্যতার পরিচয় দিতে হচ্ছে। কর্ম ও দক্ষতা বলেই তারা ওপরে উঠছেন বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের লিঙ্গসমতাবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকের চাকরিতে নারী কর্মীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশও বাড়ছে। এখন যারা চাকরিতে আসছেন এমন ব্যাংকারদের মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি রয়েছেন নারী।
অন্যদিকে নারী কর্মীদের চাকরি বদলের প্রবণতা কিংবা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও আগের চেয়ে কমেছে। ব্যাংক খাতের ওপর দেশে কার্যরত ৬০টি তপশিলি ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোতে জনবলের সংখ্যা ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৮৪। গত জুন পর্যন্ত হিসাবে দেখা গেছে, এর মধ্যে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৭১ জন। আর নারী কর্মীর সংখ্যা ২৯ হাজার ৫১৩ জন। সে হিসাবে ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মী ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।
বিশ্বে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিষয়ে প্রতি বছর ‘দ্যা গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট’ প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে ২০২১ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল শীর্ষে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে বিশ্বের ১৫৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৫তম। প্রতিবেদনটি বলছে, এমনটা সম্ভব হয়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে। প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি অনুকূল কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা ও প্রতিষ্ঠানের সর্বক্ষেত্রে লৈঙ্গিক সমতা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানসমূহের লৈঙ্গিক সমতাবিষয়ক সূচক পর্যালোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
জানা গেছে, দেশের ৬০টি তপশিলি ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মীদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর রয়েছে। ২৯টি ব্যাংক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ৫৫টি তপশিলি ব্যাংকের লৈঙ্গিক হয়রানি বন্ধের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার পরে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ৩২টি ব্যাংকের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্যাংক খাতের মোট পরিচালকদের ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারী পরিচালক রয়েছেন বিদেশি মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকের পরিচালকদের ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ নারী। বেসরকারি ব্যাংকের ১৩ শতাংশ পরিচালক নারী। আর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে এ হার ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত নারীদের হার প্রায় ৯ শতাংশ। প্রারম্ভিক পর্যায়ে ব্যাংকিং খাতে নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। এদিকে ব্যাংকে কর্মরত মোট নারী কর্মীদের মধ্যে ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকে চাকরি বদলের হার বেশি বলে প্রতিবেদনে দেখা গেছে।
ছবি :আব্দুল গনি
