সাপে কাটা রোগীর অপচিকিত্সা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৪

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া সরীসৃপ প্রজাতির শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর বসবাসের আদর্শ স্থান হওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির সাপ দেখা যায় এখানে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৯২ প্রজাতির বিষধর সাপ রয়েছে। এদের মধ্যে  ২৬টি প্রজাতি বিষধর, যার ১২টি হলো সামুদ্রিক। বাকি ১৪টি প্রজাতির মধ্যে বেশির ভাগই লোকালয় থেকে দূরে বনে-জঙ্গলে বাস করে। বিষধর সাপের প্রজাতিগুলোর মধ্যে সাধারণত পদ্মগোখরা, খইয়াগোখরা, শঙ্খচূড়ের কামড়েই আমাদের দেশে মানুষ বেশি মারা যায়। এ ছাড়া রয়েছে পাতিকালাচ ও শঙ্খিনী। দীর্ঘদিন বিলুপ্তির পথে থাকলেও সম্প্রতি তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপের নাম। অধিকাংশ প্রজাতি শান্ত স্বভাবের হলেও ঘটনাচক্রে, উত্ত্যক্ত হয়ে কিংবা ভয় পেয়ে সাপে কামড়ানোর ঘটনা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ের শিকার হয় প্রায় ৭ লাখ মানুষ এবং মৃত্যু প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি। বিষধর সাপের কামড়ের একমাত্র চিকিত্সা এন্টিভেনম। বাংলাদেশে ‘সর্প দংশন চিকিত্সা নীতিমালা ২০১৯’ অনুসারে সাপে কাটা রোগীর চিকিত্সা হিসেবে স্নেক এন্টিভেনম, কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা এবং আনুষঙ্গিক চিকিত্সা অনুসরণ করা হয়ে থাকে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিত্সা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই ঐতিহ্যগত লোকাচার, কবিরাজি চিকিত্সার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে সাপে কাটা রোগীর চিকিত্সায় ঝাড়ফুঁক, শিকড়-বাকড় কিংবা তাবিজের ওপর নির্ভরশীল। তাদের এই কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক ভ্রান্ত ধারণাকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ‘ওঝা, ফকির কিংবা বৈদ্য’ নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। অপচিকিত্সার মাধ্যমে বাড়িয়ে তুলছে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুহার।

রাজশাহী স্নেক রেসকিউ অ্যান্ড কনজারভেশন সেন্টারের তথ্যমতে, গত জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট ৩৮ জন সাপে কাটা রুগী ওঝার কাছে চিকিত্সা নিয়ে মারা গেছে। একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও কুসংস্কার যেন আমাদের পিছুই ছাড়ছে না। সাপে কাটলে হাসপাতালমুখী না হয়ে মানুষ ছুটছে ওঝা কিংবা বৈদ্যের বাড়িতে। বাংলাদেশে সাধারণত গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। তাই এসব এলাকায় ওঝাদের দৌরাত্ম্যও বেশি। উত্ত্যক্ত না করলে কিংবা খুব বেশি ভয় না পেলে সাপ সাধারণত সব ছোবলেই বিষ নিঃসরণ করে না, যা ড্রাই বাইট নামে পরিচিত। আবার অনেক সময় অজ্ঞতার কারণে নির্বিষ সাপকে বিষধর ভেবেও মানুষ ভুল করে। ড্রাই বাইট কিংবা নির্বিষ সাপের কামড়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে বোকা বানিয়ে নিজেদের রোজগার বাড়াচ্ছে ওঝা বা বৈদ্য শ্রেণির মানুষ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শরীর থেকে বিষ অপসারণ করে রোগী বাঁচিয়ে তোলার নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ্য দিবালোকে জিতে নিচ্ছে মানুষের সরল বিশ্বাস, যার ফলে গ্রামগঞ্জে কিংবা মফস্সলের মানুষ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বৃদ্ধি পাচ্ছে সাপের কামড়ে প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব কিংবা বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী শারীরিক সমস্যা। অথচ সময়মতো হাসপাতালে নিলে অধিকাংশ রোগীরই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। কেউ কেউ সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না, এমনকি তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্নও হতে হয়। ওঝার বাড়িতে নেওয়ার কারণে অধিকাংশ রোগীরই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পার হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে নিলেও রোগীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয় না। আশ্চর্যজনক হলেও এ কথা সত্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওঝার চিকিত্সার পর রোগীর প্রাণহানি ঘটলেও তা সবাই ‘নিয়তির লিখন’ ভেবে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। নিজেদের ব্যবসা চালু রাখতে ওঝারা ‘সাপে কাটা রোগীকে ঝাড়ফুঁক ছাড়া বাঁচানো সম্ভব নয়; দাঁড়াশ সাপ গাভির বাঁট চুষে দুধ খায়; সাপের মাথায় মহামূল্যবান মণি থাকে’—এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া দিনের পর দিন খেলা দেখানোর উদ্দেশ্যে তারা সাপকে বন্দি করে, অভুক্ত রেখে এবং বিষদাঁত নষ্ট করে নিজেদের বসে আনার চেষ্টা করে থাকে, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২-এর পরিপন্থী।

ওঝাদের এমন দৌরাত্ম্য ও প্রতারণার কারণে প্রতিনিয়ত দেশে সাপের কামড়ে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও এ ধরনের অপচিকিত্সা বন্ধে নেই কোনো ধরনের আইনের প্রয়োগ। বাংলাদেশে চিকিত্সকদের ভুল সংশোধনে উত্তম-মধ্যম দেওয়ার মতো ঘটনার কথা শোনা গেলেও ওঝাদের বিষয়ে যেন সবাই নীরব। আমাদের দেশ অপেক্ষা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে আরো বেশি পরিমাণ বিষধর  সাপ থাকা সত্ত্বেও সেই সব স্থানে সাপে কামড়ের সংখ্যা, পঙ্গুত্ববরণ ও মৃত্যু খুবই নগণ্য। বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীর প্রাণ বাঁচানোর পথে অন্যতম অন্তরায় এসব ওঝা বা বৈদ্য শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী, যারা প্রতিনিয়ত অপচিকিত্সা ও ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল কিংবা মফস্সলে সাপে কাটা রোগীর  প্রাণহানির সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ওঝাপ্রথা নির্মূলে পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়