ই-কমার্স প্রতারকরা শাস্তি পাবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:৫০

ই-কমার্সের নামে সাম্প্রতিক প্রতারণা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ টাকা বানানোর জন্য যে প্রতারণাটা করে, এটার শাস্তি অবশ্যই হবে। আমরা বসে নেই, সঙ্গে সঙ্গে এদেরকে ধরা হয়েছে। একবার যখন ধরা হয়েছে তখন তারা টাকাগুলো নিয়ে কোথায় রাখল, কী করল, কী সম্পদ বানাল- সেটাও কিন্তু খুঁজে বের করা হবে। এ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। জনগণের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যখনই এগুলো পাওয়া যাবে, আমরা সেগুলো ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করব। যেমন আমরা খালেদা জিয়ার ছেলে কোকোর পাচার করা কিছু টাকা ফেরত এনেছিলাম। এরকম আরো বহু টাকা আছে আমরা ফেরত আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

গতকাল সোমবার বিকালে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে এই সংবাদ সন্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেসময় ই-কমার্স প্রসঙ্গও আসে।

এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু করার আমরা কিন্তু সব করেছি। এ ধরনের হায় হায় কোম্পানি যখন সৃষ্টি হয়, আপনাদের সাংবাদিকদের একটা দায়িত্ব থাকে এই নিয়ে। সবার ওপরেই আপনাদের একটা শ্যেনদৃষ্টি থাকে। তাই এ ব্যাপারেও আপনাদের মনে হয় একটা দায়িত্ব আছে। যদি শুরুতেই আপনারা ধরিয়ে দিতে পারেন যে এই কোম্পানিগুলো হায় হায় কোম্পানি বা এখানে প্রতারণা করছে বা এরা প্রতারক। অন্যদিকে মানুষও যদি একটু সতর্ক হয় তাহলে এ ধরনের সমস্যা কিন্তু হয় না।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শরণার্থী থাকলে কিছু লোকের বোধহয় একটু লাভই হয়। তারা এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করার বিষয়টি যত বেশি দেখে, প্রত্যাবাসনের দিকে তত নজর দেয় না। অনেক প্রস্তাব আমরা পাই; এটা করা হোক ওটা করা হোক। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বলি করেন, মিয়ানমারে গিয়ে করেন। আমার এখানে করার তো দরকার নেই। ওদের নিয়ে যান। আমরা এখানে যেটুকু করার আমরা করি।’

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা এলে প্রথমে তো আমরা কয়েক মাস নিজেদের অর্থ দিয়েই চালালাম। তারপর আস্তে আস্তে আন্তর্জাতিক সংস্থা এসেছে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তো আমরা চালিয়েছি। আমাদের কাছে যখনই আন্তর্জাতিক সংস্থা নানা দাবি করে, আমি সোজা বলে দেই, মিয়ানমারে নিয়ে যান। ওখানে ঘর করেন, স্কুল করেন, হাসপাতাল করেন। এখানে যেটা করার সেটা তো আমি করেই দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যা ও এর স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়, যা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখবে বলে আমি আশা করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা, সবকিছুতেই যেন একটা ব্যবসা। এর মধ্যে কিছু আছে আন্তরিক, কিছু আছে শুনে যায়—সমস্যাটা এখানেই। ১৯৯২ সাল থেকেই তারা (রোহিঙ্গারা) আছে। ৩ লাখের মতো ছিল। পরে আসল ৭-৮ লাখ। ১১ লাখে দাঁড়াল। আর পাকিস্তানি শরণার্থী তো সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই আছে। তাদের তো আর ফেরতই নিলো না। সেটা আবার সবাই ভুলেও গেছে যে আমরা আরো এক বিশালসংখ্যক শরণার্থী পালন করছি। তারা হলো পাকিস্তানের শরণার্থী। পাকিস্তান তাদের নেয় নাই, নেবেও না। আর রোহিঙ্গাদের কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, এখন যেহেতু একটা পরিবর্তন এসেছে আমি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বলেছি, আপনারা এই সময়ে কেন চাপ দেন না? কারণ এরা আমাদের পুরো পরিবেশটাকেই নষ্ট করেছে। উখিয়া এখন ন্যাড়া হয়ে গেছে, জঙ্গলের চিহ্ন নেই।

আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা নির্বাচনকে নির্বাচন হিসেবে দেখি। কখনো আত্মতুষ্টিতে ভুগি না। জনগণের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন এবং তাদের ভোট নিয়েই ক্ষমতায় আসতে চাই। জনগণ ভোট দিলে আসব, নতুবা আসব না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কখনোই অন্যের সমালোচনার দিকে মনোযোগ দেননি। নিজের কাজ তিনি নিজেই করেছেন। বঙ্গবন্ধু যে পথে হেঁটেছেন, আমিও সেই পথে হাঁটব।

বিএনপির নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পালটা প্রশ্ন রেখে বলেন, কারা কেন কোন সুখের স্বপ্নে বা কোন আশার আলো দেখে বিএনপিকে ভোট দেবে? সেটাও একটু জিগ্যেস করেন, জেনে রাখি। জনগণ ভোট দিতে পারছে না বলে যারা অভিযোগ করছেন, তাদের কে ভোট দেবে, সে প্রশ্নও উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির একজন এতিমের টাকা চুরি করে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, আরেক জন গ্রেনেড হামলার মামলায় কারাদণ্ড নিয়ে দেশান্তরী, সাজাপ্রাপ্ত আসামি। একটা দল কীভাবে জিতবে, তার নেতৃত্বটা কোথায়? জনগণ কোন ভরসায় ঐ দলকে ভোট দেবে? আসলে বিএনপি জানে যে নির্বাচনে তাদের আর কোনো সম্ভাবনা নেই, সে কারণেই তারা নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন অনেক নির্বাচন হচ্ছে। করোনার মধ্যেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে। যারা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সেই দলটির জন্মটা কোথায়? সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারীর হাতে তৈরি এই দল (বিএনপি)। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। ঐ নির্বাচনে বিএনপি জিততে পারল না কেন?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫-পরবর্তী ক্যু-পালটা ক্যুর নামে বিমান বাহিনীসহ সামরিক বাহিনীর অসংখ্য অফিসার-সদস্যকে বিভিন্ন কারাগারে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন কারাগারে খোঁজ নিলেই ঐ সময়ে কত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, লাশ গুম করা হয়েছে—সেই তথ্য পাওয়া যাবে। এত বছর পরে হলেও মানুষের মধ্যে চেতনা এসেছে। জেনারেল জিয়া তার অবৈধ ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে হত্যা এবং লাশ গুম করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের হত্যার বিচার বিএনপি কিন্তু করেনি। কথিত বিদ্রোহের একটা বিচারের নামে ৯ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। এটার অবশ্যই একটা তদন্ত হওয়া দরকার। বিমান বাহিনীসহ পুরো সামরিক বাহিনীর প্রায় ২ হাজার সদস্যকে জিয়ার আমলে হত্যা করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, আরো জনমত গঠন হওয়া দরকার।

করোনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এইটুকু বলব যে আমরা চেষ্টা করেছি। আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ এই কারণে যে, যখনই আমরা আহ্বান করেছি করোনা মোকাবিলা করার জন্য যা যা করণীয়, তারা সেটা পালন করেছেন।

এদিকে লন্ডনে ব্রিটিশ এমপি বঙ্গবন্ধুর নাতনী টিউলিপ সিদ্দিকীর গাড়িতে হামলা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা সত্যি দুঃখজনক। তবে আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। ব্রিটেনের মতো একটি সভ্য দেশে এমন অসভ্যতা সেদেশের সরকারই দেখবে।’ 

সংবাদ সম্মেলনে গণভবন প্রান্তে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ এমপি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এম ইহসানুল করিম।