রাসেল টি আহমেদ
সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়ার প্রতিটি গল্পই আমাদেরকে শিহরিত করে, ভেতরে নাড়া দেয়, উল্লসিত করে, নৈতিক উন্নতি সাধন করে কিংবা নতুন কিছুর শিক্ষা দেয়। একটি জাতির ভিত্তি তৈরিতে এমন হাজারো গল্প একত্রিত হয়ে সামনে আসে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের জাতির পতাকা বহনকারী এবং নেতৃবৃন্দের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে আমাদের দেশের মাটিতে, লালিত হয়েছে ও পরিপক্কতা পেয়েছে দেশের শিক্ষকদের ভালোবাসা, পরম যত্ন এবং দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। একটি মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে এবং পথচলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য, যদিও সময়ের পরিক্রমায় তাদের নিরন্তর অবদান খুবই কম স্বীকৃতি পায়।
যখনই আমি আমার শিক্ষা জীবনের স্মৃতিগুলোকে স্মরণ করি, তখনই আমি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা দেখতে পাই। শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন কঠোর শাষণ ও শাস্তি থাকলেও বাইরে পারষ্পরিক সম্পর্কগুলো খুবই আত্মিক। সেখানে অভিভাবকদের সম্পর্ক খুবই কম বা নেই বললেই চলে। গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, “যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়”। তবে বর্তমানে আমরা ভিন্নরূপ দেখতে পারছি। এখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্ক খুবই আনুষ্ঠানিক হয়ে যাচ্ছে। এই পারষ্পরিক সম্পর্কগুলোতে ভিন্নরূপে পরিবর্তন আসলেও শিক্ষকদের প্রতি মূল্যবোধ এবং অনুভূতি এখনও আগের মতোই আছে।
আমার মা দীর্ঘ ৪০ বছরেরও অধিক সময় ধরে শিক্ষকতা পেশায় থাকার কারণে আমি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত জীবন, তাদের ত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার বিষয়গুলো খুবই নিকট থেকে দেখেছি। তাঁরা তাঁদের কর্মজীবনে কতোটা দরদ দিয়েছেন সেটি খুবই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। সম্ভবত এই কারণেই পরবর্তী সময়ে আমাকে শিক্ষা-প্রযুক্তি খাতে কাজ করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এই খাতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমি শিক্ষকদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি এবং বিভিন্নভাবে তাদের কাজকে সহজ করার চেষ্টা করেছি। গত এক দশক ধরে ক্লাসটিউন এবং চ্যাম্পসটোয়েন্টিওয়ান ডটকম শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, ইন্টারর্যাক্টিভ পদ্ধতিতে শিক্ষাদান এবং শিক্ষা প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশনের কাজ করছে। এই অগ্রযাত্রায় সকল সম্মানিত অংশীদারদের অবদানকে সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, সকল শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা পান না। ভাসমান নৌকা, গাছের নিচে, খোলা আকাশের নিচে কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ যেখানেই পাঠদান করেন না কেনো, শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যোগাতে শিক্ষকরা কোনো ছাড় দেন না। স্মার্টবোর্ড কিংবা চক ও স্লেটের মধ্যে যতোই পার্থক্য থাকুক না কেনো আমাদের প্রতি শিক্ষকদের শিক্ষা, শিক্ষার মান এবং জীবনমুখী শিক্ষাদান সবসময়ই সমান থাকে। আমাদের অগ্রযাত্রার প্রতিটি স্তরের মজবুত ভিত্তি যারা গড়ে দিয়েছেন এবং ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে আমরা একটি সংস্কৃতি ও উদাহরণ তৈরি করছি। ‘স্যালুটিং দ্য নেশন বিল্ডারস’ শীর্ষক এই উদ্যোগের মাধ্যমে, আমাদের যে সীমাবদ্ধ সক্ষমতা আছে সেটি দিয়েই সকলে যাতে কিছু সময়ের জন্য হলেও শিক্ষকদের স্মৃতি রোমন্থন করেন সেই চেষ্টাই করেছে ক্লাসটিউন। এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়েছেন স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত দেশের বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ। তারা তাদের সম্মানিত শিক্ষকদের অবদান ও ভালোবাসাকে গর্বের সাথে তুলে ধরেছেন ভিডিও বার্তায়। আমরা নিশ্চিত, আবেগাপ্লুত সেইসব ভিডিও সকলের হূদয় ছুঁয়ে যাবে। মনের পর্দায় উঁকি দিবেন আপনাদের প্রিয় শিক্ষকরা। সত্যিকারের জাতির কারিগর সকল শিক্ষকদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।
লেখক : ক্লাসটিউন, চ্যাম্পসটোয়েন্টিওয়ান ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
