সনাতনী বাঙালির মননে মহালয়া

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ২০:২৫

 শ্যামল সরকার

 

মহামায়া সনাতনী শক্তিরূপা গুণময়ী। তিনি এক, তবু তার প্রকাশ বিভিন্ন। কখনো দেবী নারায়ণী, আবার ব্রহ্মশক্তিরূপা ব্রহ্মাণী, কখনো মহেশ্বেরী রূপে প্রকাশমানা, কখনো-বা নির্মলা কৌমারী রূপধারিণী, কখনো মহাবজ্ররূপিনী ঐন্দ্রী, উগ্রা শিবদূতী, নৃমুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা, তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি। এই সর্বপ্রকাশমানা মহাশক্তি পরমা প্রকৃতির আবির্ভাব হবে— সপ্তলোক তাই আনন্দমগ্ন।

হে ভগবতী মহামায়া তুমি ত্রিগুণাত্মিকা, তুমি রজোগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী বাগ্দেবী। সত্ত্বগুণে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী। তমঃগুণে শিবের পত্নী পার্বতী। আবার ত্রিগুণাত্মিকার অতীত। দেবী ঋষি কাত্যায়নীর কন্যা কাত্যায়নী। তোমার আবির্ভাবে ধরণী হোক আনন্দময়ী।

এমন কথামালায় গাথা স্তুতির বজ্রকণ্ঠের সুর ভেসে আসতেই পড়ে যায় ঢাকে কাঠি। বুঝতে বাকি থাকে না অকাল বোধনের আহবান এসে গেছে; মা আসছেন। বোধ করি এ কথাগুলো বুঝতে আর কারো বাকি নেই যে কী বিষয়ের অবতারণা হচ্ছে। সেই ছোট্টকালে যবে মন-চেতনা জাগ্রত হয়েছিল সেদিন থেকে প্রতিটি সনাতনী বাঙালির ঘরে ঘরে শরতের এই আহ্বান আজও অম্লান। শরতের পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবী পক্ষের সূচনালগ্নে শুরু হয়ে যায় মহালয়া বা চণ্ডী থেকে স্তব বা স্তুতি পাঠ, দেবির আরাধনা, নারায়ণী স্তুতি। এমন মনকাড়া স্তুতি সে তো একজনের কণ্ঠেই মানায়। তিনি প্রয়াত বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র।

মহালয়ার গুরুত্ব বাঙালির কাছে ভিন্ন মাত্রা বহন করে চলেছে। ধর্মীয় বা পৌরাণিক মতে সপ্তলোক বলতে আকাশ মন্ডলের সাতটি স্তরকে বোঝানো হয়। সনাতন মতে সাত স্বর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মান্ডের ঊর্ধাংশ সাতটি লোক বা জগতের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে ভূলোক (পৃথ্বীলোক বা পৃথিবী), ভুবর্লোক, স্বর্লোক, মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক এবং সবার ঊর্ধ্বে সত্যলোক বা ব্রহ্মলোক। হিন্দু পুরাণ এবং অথর্ববেদে ১৪টি লোকের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি স্বর্গ; বাকি সাতটি পাতাল বা নরক। সপ্ত স্বর্গের ঠিক নিচেই সপ্ত পাতাল অবস্থিত। স্বর্গের রাজধানী হচ্ছে অমরাবতী এবং ঐরাবত স্বর্গের প্রবেশদ্বার পাহারা দিচ্ছে। দেবরাজ ইন্দ্র সেখানে স্বসভায়  (ইন্দ্রলোক/ ইন্দ্রপুরী) বিরাজমান।

মহালয়াকে অতি পুণ্যময় তিথি হিসাবে পালন করা হয়। মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হলো প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাঁকে তাঁর পূর্বপুরুষের মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়। এই তিথিতে পৃথিবী স্বর্গলোকে পরিণত হয় বলে সনাতনী বিশ্বাস। বলা হয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা উত্তর পুরুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হয়ে যান এই পুণ্যলঘ্নে, তখন মহামায়ার স্তবগাথা স্তুতি বেজে উঠে ভুবনজুড়ে। এদিনটি দুর্গা পূজার আগমনী বার্তা বয়ে আনে ভুবনে। দিন যতই বদলে যাক মহালয়ার দিন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়ার ধ্বনি না শুনলে যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাঙালির ঘরে আজও রেডিও টিকে আছে যেন শুধুমাত্র বছরে একবার মহালয়া শোনার জন্যই। যদিও আজ ইন্টারনেটের যুগ। কিন্তু তাতেও প্রতি মহালয়ার ভোরে বাংলার ঘর থেকে মহালয়ার ধ্বনি ও মন্ত্র শোনা যায়। আর মহালয়া থেকেই যেহেতু দেবীপক্ষের সূচনা হয় তাই মহালয়ার দিন থেকে যেন গোটা প্রকৃতি মেতে ওঠে শারদোত্সবের আনন্দে। আর এই মহালয়াই বাড়ির বাইরে থাকা মানুষদের ফেরানোর কথা মনে করিয়ে দেয়।

তবে কেনো গুরুত্বপূর্ণ এই মহালয়া— এই প্রশ্ন জাগতেই পারে অনেকের মনে। কারণ একটিই, সেটি হলো, অনেকেই পিতৃ-মাতৃকুলের শ্রাদ্ধাদি তিথি যোগ অনুযায়ী করতে পারেন না বা ভুলেও যান কখনো। এদিনে এই কাজটি তারা করতে পারেন। পাশাপাশি, পূর্ব তিন পুরুষের আত্মার শান্তি কামনার জন্য এটি উত্কৃষ্ট দিবস। তর্পণের জন্য এই দিবস প্রশস্ত। গঙ্গায়, পুকুরে এমনকি বাসায় বসে বিশেষ ব্যবস্থায় এই দিনে পূর্ব তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ দান ইত্যাদি করা হয়। তিল জল বা শুধুমাত্র জল দ্বারাই এই তর্পণ চলতে পারে। এদিন পূর্বপুরুষের যাত্রা পথকে আলোকিত করার জন্য উল্কাদান করেন। রামচন্দ্র বনবাসে থাকার সময় শুধুমাত্র জল দিয়ে তর্পণ ক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। তর্পণাদির দ্বারা পূর্বপুরুষগণ তৃপ্ত হন; এমনকি নরক যন্ত্রণা থেকেও মুক্তি পেতে পারেন। শুধু পূর্বপুরুষ কেনো—এটি এতটাই সর্বজনীন যে, জগত্বাসী, শত্রু-মিত্র, পশুপাখি সকল প্রাণীর উদ্দেশ্যেও তর্পণাদি করা হয়ে থাকে। যারা তর্পণাদি করেন তারা তর্পিত সকলের নিকট থেকে বিশেষ আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন। ঋষিগণ, পিতা-মাতা ও সমাজমিত্রগণের নিকট আমাদের যে ঋণ থাকে সেটিও এই তর্পণের দ্বারা পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়। 

‘ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রয়ম, আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্তং তৃপ্যন্তু’— তর্পণ ছাড়া মুক্তি নাই, মুক্তি নাই বলেও মন্ত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া ছাড়াও অনেকে দেবী দুর্গার বোধন কর্ম করে থাকেন। বোধন অর্থ জাগরণ। অর্থাত্, দেবীকে জাগিয়ে তোলার কাজটি শুরু হয়ে যায় শ্রী শ্রী চণ্ডীর স্তব বা স্তুতির মাধ্যমে। মহালয়ার পরেই শুরু হওয়া দেবীপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে ঘট বসিয়ে দুর্গা পূজার সূচনা করেন অনেকে।

শ্রাবণ থেকে পৌষ—এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন, দক্ষিণায়নের কালকে দেবতাদের ঘুমের কাল বলে গণ্য করা হয়। তাই বোধন করে দেবতাদের জাগিয়ে তোলার কাজটি করা হয়। আর দেবী দুর্গার যে বোধন করা হয় তাকে অন্য নামে ‘কল্পারম্ভ’ বলা হয়ে থাকে। অবশ্য ষষ্ঠী তিথিতে পূজার প্রধান ক্রিয়াদি শুরু হয়। সপ্তমি থেকে বিগ্রহে পূজার কাজ শুরু হয় এবং সেইসঙ্গে নবমী পর্যন্ত শ্রী শ্রী চণ্ডী পাঠ চলে।

শ্রী শ্রী চণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত কাহিনিতে জানা যায়, প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট সমুদ্রে পরিণত হলে ভগবান বিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্ত নাগকে শয্যা করে যোগ নিন্দ্রায় যান। সেই সময় ভগবানের কর্ণমূল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়। তারা ভগবানের নাভিকমলে অবস্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হয়। ভীত ব্রহ্মা তখন ভগবানকে জাগ্রত করার জন্য তাঁর নয়নাশ্রিত যোগ নিদ্রাকে (দেবি দুর্গা) স্তব করতে থাকেন। আর ভগবান সেই স্তবে খুশি হয়ে দেবিকে জাগ্রত করলেন। দেবি প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে সেই দুই দানবের সঙ্গে যুদ্ধ করেন।

মহালয়া নিয়ে একাধিক কাহিনি শোনা যায়। মহাভারতের কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে তাঁকে স্বর্ণ ও রত্নাদি খাদ্য হিসাবে দেওয়া হয়। কর্ণ এমন খাদ্য বিচিত্রতার কথা জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, তিনি সারাজীবন শুধু স্বর্ণই দান করেছেন, তাঁর পিতৃ-মাতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনো খাদ্য দান করেননি। তাই স্বর্গে তাঁকে স্বর্ণ দান করা হয়েছে। এ সম্পর্কে কর্ণের জবাব ছিল—তিনি তাঁর পিতৃগণের পরিচয় সম্পর্কে কিছু জানতেন না বলে কোনো খাদ্য দান করেননি। এরকম অবস্থায় কর্ণকে বলা হয়, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ তিথিতে ষোলো দিনের জন্য পৃথিবীতে গিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দান করবেন। আর আশ্বিনের অমাবস্যা তিথিতে শেষ জল দান করে তিনি স্বর্গে ফিরে যাবেন। এই বিশেষ পক্ষকাল সময় সনাতন শাস্ত্রে পিতৃপক্ষ হিসাবে স্বীকৃত। আর পিতৃপক্ষের শেষ দিন হলো মহালয়া।

সনাতন পুরাণ মতে, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এইলোক স্বর্গ ও মর্ত্যর মাঝে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক হলেন যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী বা চতুর্থ প্রজন্মের আরেকজন পিতৃলোকে গমন করলে সর্বপ্রথম ব্যক্তি কর্ম অনুযায়ী ক্ষেত্রে লোকান্তরিত হন।

 

লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক

 ট্রাস্টি, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।