সামষ্টিকভাবে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের দুটো জন্মতারিখ। একটা সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত আর অন্যটি মনুষ্য প্রদত্ত। আমাদের এই প্রবণতাকে রোধ করার জন্যই হয়তো ১৮৭৩ সালে বৃটিশ সরকার তত্কালীন বাংলায় জারি করেছিল জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন। আইনের শুভ অশুভ কোনো কিছুকেই আমল না দিয়ে আমরা থেকেছি নির্লিপ্ত। তাই শতাধিক বছরেও কোনো দৃষ্টিগোচরমূলক পরিবর্তন আসেনি আমাদের চিন্তায়। সেজন্য বৃটিশদের পাশ করা আইনকে রদ ও রহিত করে ১৩১ বছর পরে নতুন করে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন জারি হয় ২০০৪ সালে। আইনটি কার্যকর হয় ২০০৬ সালের ৩ জুলাই হতে। আইন কার্যকর হওয়ার তারিখককে বিবেচনায় রেখে ২০০৭ সাল হতে দেশে জাতীয় পর্যায়ে জন্মনিবন্ধন দিবস ঘোষিত হয় প্রতি বছরের ৩ জুলাই।
কিন্তু আমাদের ঐ যে অভ্যেস জন্মতারিখ পালটানো। সেই অভ্যেসকে মাথায় রেখে প্রায় একযুগ পরে পালটে গেল দিবস। এখন তা ৬ অক্টোবর। নামেও পালটাল একটু—জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। দেশে এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন সনদ দুটো দুটোর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে! ২০০৪ সালে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন হলেও তখন দেশে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো ধারণা ছিল না। ২০০৭ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করতে গিয়ে পর্যায়ক্রমে এসে পড়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ধারণা। অস্বীকার করার কোনো কারণই নেই যে, জাতীয় পরিচয়পত্রের গুরুত্ব অধিকতর।
২০০৮ সাল হতে ২০১৫ সালের শুরু পর্যন্ত জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকা অবস্থায় সবসময়ই মনে হয়েছে একাধিক জন্মনিবন্ধন রোধ করার জন্য জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে ভালো হতে পারত জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র একই প্রতিষ্ঠানের আওতায় পরিচালিত হওয়া। সেই লক্ষ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পাঁচটি বিধিকে সমন্বিত করে একটি বিধির আওতায় আনা। উদ্যোগ ছিল ১৮ বছর বয়সের আগে পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন সনদ আর ১৮ পার হলেই নাগরিক চলে আসবেন জাতীয় পরিচয়পত্রের আওতায় আনয়নের। বাস্তব অবস্থা দেখা যাচ্ছে, মানুষের পরিচয়ের দুটো পরিচয়ই তার প্রাবল্য বিস্তারের জন্য দৃঢ় সংকল্প।
দুটো কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য সন্তানের জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দেওয়া হলে দুটো কাঠামোর মধ্যে একটা সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারত এবং ভুল জন্মতারিখ দিয়ে বা একাধিক জন্মনিবন্ধনের প্রবণতা রোধ পেত।
এখন শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে হলে পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন করে নিতে হয়। ভাগ্যিস পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধনের সময় তাদের পিতা-মাতার জন্মনিবন্ধন লাগে না। শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। বাল্যবিবাহ দিতে, শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বা অন্য আরো নানান কাজে জন্মতারিখ পালটাতে হলে তা পালটানো যাচ্ছে সহজেই। কেননা খোলনলচে সব রয়ে গেছে নিজের হাতে। ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন করতে হলে পিতা-মাতার একাধিক জন্মনিবন্ধন করেই সিদ্ধি সাধন করছেন আগ্রহীগণ। আর এই সুযোগেই করোনাকালে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহের সংখ্যা।
বাল্যবিবাহ নিরোধের জন্য জন্মনিবন্ধন সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যদি তা আমরা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারি। আমরা জন্মনিবন্ধন সনদে পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্যবহার না করে জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে নিজেকে ফাঁকি দিয়ে চলেছি নিজেরাই। এই শুভংকরের ফাঁকি দূর করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধ করতে হলে প্রথমে রোধ করতে হবে জন্মতারিখ-সম্পর্কিত তঞ্চকতা। তাহলে প্রথমেই নিজেকে বাঁধতে হবে অন্যের বন্ধনে। আর সেটা হলো—জন্মনিবন্ধন সনদে পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবসে আমরা না হয় নতুন করে একটু ভাবি—বাল্যবিবাহ রোধসহ জন্মতারিখ-সম্পর্কিত ভুলত্রুটি রোধের জন্য আমরা কঠোর হব কি না!
n লেখক:জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রকল্পের
সাবেক প্রকল্প পরিচালক
