জগতের যে কোনো ভালো বা খারাপ পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে বদলাইয়া যাইতে পারে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ হইতে আকস্মিক বজ্রপাত যেমন যে-কাহারো ভবলীলা সাঙ্গ করিতে পারে, তেমনি মানুষের জীবনেরও আক্ষরিক অর্থেই ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’। শিল্পী ফিরোজ সাঁই তাহার এই ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ গানটি মঞ্চে গাহিতে গাহিতেই মারা যান। আমরা দেখিয়াছি চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ‘আমার আর একটি কথা আছে’—ইহা বলিবার পরমুহূর্তেই মঞ্চের ডায়ামে মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়েন। তাহার ‘আর একটি কথা’ আর কখনই জানা যাইবে না। এই সকল কথার সূত্র ধরিয়া আমরা বলিতে পারি—মানুষের জন্যই তো রাজনীতির উদ্ভব, সেই রাজনীতিতেও ক্ষমতার পালাবদল ‘দুই দিনের ব্যাপার’ মাত্র। ইহার প্রমাণ সারা বিশ্বে প্রচুর রহিয়াছে। ফরাসি বিপ্লব বিশালভাবে পালটাইয়া দিয়াছিল ইউরোপের রাজনীতি। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে জারদের অত্যাচারের এক পর্যায়ে রুশ বিপ্লব হইয়াছিল। এক পর্যায়ে রাশিয়ার সাধারণ জনগণ ক্রমশ অনুধাবন করিতে শুরু করে—কোথায় যেন মহাভুল হইয়া গিয়াছে। জারদের হাত হইতে মুক্তি পাইয়া তাহারা যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধ কানাগলিতে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। পতন ঘটিয়াছিল সমাজতন্ত্রের।
অনেকে এখন সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের একটি মিশ্রণ ঘটাইতে চাহেন। অনেকটা তেল ও জলের মিশ্রণের মতো। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়—উহা দ্বারা গরিবের উপকার হইবে না। কিন্তু ইহা কি সত্য? মনে রাখিতে হইবে, সমাজতন্ত্র হইল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। সমাজতন্ত্রে সমাজের পণ্য ও সেবার উত্পাদনের এবং বিতরণ করিবার পদ্ধতি নির্ধারণ করা থাকে, অন্যদিকে গণতন্ত্রে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উল্লেখ করা হয়—কীভাবে একটি সরকার গঠিত হইবে এবং পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করিবে। কিন্তু যাহা স্পষ্ট করিয়া বলা প্রয়োজন, তাহা হইল—রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বিকল্প নাই। কারণ, রাজনীতি ছোটলোকদের জায়গা নহে, উহা ভদ্রলোকদের জায়গা। কিন্তু রাজনীতিতে অশিক্ষিত, অমার্জিত ও ছোটলোকদের প্রবেশ ঘটিলে যাহা ঘটিতে পারে, তাহার কিছু কিছু আলামত আমরা নানান সময়ে নানান ঘটনার ভিতর দিয়া দেখিয়াছি। আইন সকলের জন্য সমান বটে। কিন্তু আইন কি এই কথা বলে যে, আপনি বিনা চার্জে বিনা অভিযোগে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে আটকাইয়া রাখিতে পারেন? বিশেষ ক্ষমতায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিতে জনগণের প্রতিনিধিকে গ্রেফতার করিয়া কি তাহাকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা যায়? যাহা করা যায় না, যাহা উচিত নহে, যাহা শিক্ষা ভদ্রতা ও মার্জিত রুচির সহিত যায় না—তাহারই অনেক ধরনের ঘটনা আমরা সারা বিশ্বেই মাঝেমধ্যে দেখিতে পাই। বিশেষ করিয়া, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার অহরহ শিকায় তোলা হয়। কিছুদিন পূর্বে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক জেমস টিলে তাহার গবেষণায় দেখিয়াছেন শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও রাজনীতি আছে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আছে। শিম্পাঞ্জিদের রাজনীতিতে হরদম দলবদল চলিতে থাকে। ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাইতে তাহারা বন্ধুকে বাদ দিয়া শত্রুর সঙ্গেও মিত্রতা করে। শিম্পাঞ্জিরাও জেতার জন্য কোয়ালিশন তৈরি করে, কিন্তু সেই জোটে একজন দুর্বল শিম্পাঞ্জি তাহার চাইতে শক্তিধর কাউকে নেয় না।
পরিতাপের সহিত আমরা দেখিতে পাই, শিম্পাঞ্জিদের রাজনীতি হইতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের রাজনীতি অধিক কলুষিত হইয়া যাইতেছে। এখন রাজনীতিতে কোনো নীতি-আদর্শের বালাই নাই। রাজনীতি যেন একটা টাঁকশাল! রাজনীতি যেন শুধু ন্যায়নীতি লঙ্ঘন—যেইখানে মতলববাজদের আনাগোনা ইহার শুভ্রতার ওপর কালিমা লেপন করে। শিম্পাঞ্জিরা আমাদের এই রাজনীতি জানিতে পারিলে আমরা নিশ্চয়ই লজ্জা পাইব। কিন্তু আমরা তো সৃষ্টির সেরা জীব, তাহার ছাপ কি রাজনীতিতে থাকিবে না?
