প্রযুক্তির আসক্তি বর্তমান সমাজে বিরাজমান একটি ভয়ংকর ব্যাধি। ‘নোমোফোবিয়া’ তন্মধ্যে অন্যতম। মানসিক চিকিত্সকদের মতে, মোবাইল ফোনের সঙ্গে ব্যবহারকারীর মাত্রাতিরিক্ত মনোসংযোগের অপর নাম ‘নোমোফোবিয়া’। নোমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে নো (No); মো (Mobile) এবং ফোবিয়া (Phobia) থেকে, যার সমন্বিত মানে হচ্ছে মোবাইল ফোন নেই এমন ফোবিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নোমোফোবিয়ার ব্যাপকতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, বর্তমানে এর উপসর্গসমূহের আলাদা শ্রেণীকরণ প্রায় অসম্ভব। নোমোফোবিয়া সাধারণত তরুণদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটলেও বর্তমানে এই সমস্যা ছোট-বড়নির্বিশেষে সবার মধ্যেই ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাদকাসক্তির মতোই ভয়ংকর এই ডিজিটাল নেশাটি বর্তমান সমাজে নীরবে নিভৃতে এক মহামারি রূপ ধারণ করেছে।
যে কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই কল্যাণকর, যখন ব্যক্তি তার নিজের ওপর পূর্ণনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। বিখ্যাত মনীষী ক্রিশ্চিয়ান লুইস লেঞ্জের মতে, ‘প্রযুক্তি একটা উপকারী দাস এবং ভয়ংকর মালিক’। বর্তমান যুগের ডিজিটাল আসক্তি ‘নোমোফোবিয়ার’ ফলে মানুষ আজ অনেকটাই প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়েছে। ঘুম ভাঙা ভোর থেকে শুরু করে ফের ঘুমাতে যাওয়ার আগ অবধি দিনের মূল্যবান সময়ের অধিকাংশই কেড়ে নিচ্ছে হাতে থাকা বিজ্ঞানের অসাধারণ আবিষ্কার এই মোবাইল ফোন। এর ইতিবাচক ব্যবহার যেমন ভৌগোলিক দূরত্বকে হ্রাস করেছে তেমনি এর নেতিবাচক ব্যবহার মানবিক দূরত্বকে কয়েক যোজন বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বছর কতক আগেও অস্তিত্বহীন, কল্পনাতীত এই ‘নোমোফোবিয়া’ ব্যাধিটি আজ দেশ-বিদেশের মনোবিজ্ঞানী মহলের উদ্বেগের বিষয়। শুধু তাই নয়, বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এটি হয়ে উঠেছে মনোসামাজিক ব্যাধি বিস্তারের এক অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল। বর্তমানে কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে ছোট শিশুরাও এই ভয়ংকর ব্যাধিগ্রস্ত। যার উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পড়াশোনার ক্ষেত্রে। খাওয়া-দাওয়া থেকে যে কোনো যাবতীয় কর্ম সম্পাদনে মোবাইল ফোন যেন তাদের অনিবার্য সঙ্গী। তাছাড়াও আজকালকার অনেক শিশু-কিশোরই বাহিরের পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের নিজস্ব একটা জগত্ গড়ে তুলেছে হাতে থাকা মোবাইল ফোনকে ঘিরে।
এক কথায়, নোমোফোবিয়ায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি মোবাইল ফোনের সঙ্গে এক অস্বাভাবিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং এতে করে আক্রান্ত ব্যক্তি সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। আর তাদের এই বেপরোয়া মোবাইল আসক্তি ও সমাজ বিকেন্দ্রিক আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকদের বাধ্য করে অপরিণত বয়সে মোবাইল কিনে দিতে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের অভিভাবক মহলের কুপ্রভাব কিংবা অসাবধানতা নেহাতই কম নয়। শিশুর যত্নে অসাবধানতা, আবেগপ্রবণতা, ব্যক্তিগত কর্মব্যস্ততা এই ব্যাধি বিস্তারের উল্লেখযোগ্য প্রভাবক। তাছাড়া চাকরিজীবী অনেক মা-বাবাই শিশুর সক্রিয় সঙ্গী হিসেবে অগত্যাই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন মোবাইল ফোন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবক শ্রেণির মানুষের মোবাইল আসক্তি শিশু মনে প্রভাব বিস্তার করে। কারণ শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। এভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনায় শিশু-কিশোরদের মোবাইল আসক্তি তৈরি হচ্ছে। আর এভাবেই জাতির ভবিষ্যত্ বলে বিবেচ্য নতুন প্রজন্ম ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে মোবাইল ফোন কেন্দ্রিক বিভিন্ন অনলাইন গেমস, কার্টুন, পর্নোগ্রাফিসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু-কিশোররা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের জন্য অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে নানা রকম অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষতিসাধন ব্যতিরেকে ও মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের মাত্রাতিরিক্ত নীল রশ্মি আমাদের চোখের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। তাছাড়া এই নীল রশ্মি মস্তিষ্ককে ঘুমাতে দেয় না। ফলে ধীরে ধীরে ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিক কর্মক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি লোপ পায়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণক্ষমতার পাশাপাশি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অবনতি ঘটে। ফলে ব্যক্তি সামাজিক জীবের তকমাধারী এক অসামাজিক যন্ত্রমানবে পরিণত হয়।
নোমোফোবিয়া আমাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতিসাধন করে। শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই এর দীর্ঘকালীন প্রভাব মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আর এই গোপন মহামারির কবল থেকে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জনসচেতনতা জরুরি। এছাড়াও এ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে অবসর সময়ে বই পড়া, খোলা মাঠে খেলাধুলা করা, বাগান করা, অভিভাবক হিসেবে বাচ্চাদের সময় দেওয়া, খবরের কাগজ পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, গান করা কিংবা যে কোনো শখের কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এভাবে ব্যক্তির সৃজনশীলতা বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এই নীরব মহামারির অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।
