সাগরপথে জাপান যেতে বাসা ছাড়েন তিন বান্ধবী

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৫

রাজধানীর পল্লবীর বাসা থেকে ‘নিখোঁজ’ তিন কলেজছাত্রী ছদ্মবেশ নিয়েছিল যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা না পড়ে। অভিভাবকদের অতিরিক্ত শাসনে বিরক্ত ছিলেন তারা। হারিয়ে ফেলেন লেখাপড়ায় আগ্রহ। আসক্ত হয়ে উঠে বিভিন্ন অপসংস্কৃতিতে। জাপানি সিরিয়াল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে জাপানি সংস্কৃতির প্রতি গড়ে উঠে সীমাহীন আগ্রহ। তিন জন মিলে ঠিক করে জাপানেই চলে যাবে। আর জাপানে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই তারা বাসা থেকে বের হন। পরিকল্পনা ছিল কক্সবাজার থেকে সাগরপথে জাপানে যাবেন। কথা ছিল জনৈক হাফসা চৌধুরী তাদের জাপান যেতে সাহায্য করবে। সেজন্য কক্সবাজারে হাফসা চৌধুরীর দুই লোক কৌশলে ঐ তিন ছাত্রীর সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার ও কিছু টাকা নিয়ে যায়। এরই মধ্যে ওরা খেয়াল করে র্যাবের একটি দল তাদের অনুসরণ করছে। আতঙ্কিত হয়ে মঙ্গলবার রাতে তারা ঢাকার বাসে উঠে। গতকাল বুধবার সকালে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় এলে সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে র্যাব।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র্যাব-৪-এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, তিন জন একসঙ্গেই ঘর ছেড়েছিল, উদ্ধারের সময়ও তারা একসঙ্গে ছিল। শিগিগর তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তারা তিন জনই সুস্থ আছেন। র্যাব-৪-এর উপঅধিনায়ক মেজর রবি খান জানান, ঘটনার পর থেকে আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলাম।

প্রসঙ্গত :গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে দিলখুশ জান্নাত নিশা, কানিজ ফাতেমা ও নেহা আক্তার নামে তিন বান্ধবী বাসা থেকে বের হন। মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজের ঐ তিন ছাত্রী কলেজ ড্রেস                 পরে এবং ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিলেন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নগদ ৬ লাখ টাকা, স্বর্ণের গহনা, স্কুল সার্টিফিকেট ও জন্মনিবন্ধনপত্র নেন সঙ্গে করে।

এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে দিলখুশ জান্নাত নিশার বড় বোন অ্যাডভোকেট কাজী রওশন দিল আফরোজ বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- মো. তরিকুল্লাহ, মো. রকিবুল্লাহ, জিনিয়া ওরফে টিকটক জিনিয়া রোজ ও শরফুদ্দিন আহম্মেদ অয়ন। এ ঘটনায় গ্রেফতার রকিবুল্লাহকে গত রবিবার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। অন্যদিকে আসামি মো. তরিকুল্লাহ, জিনিয়া ওরফে টিকটক জিনিয়া রোজ ও শরফুদ্দিন আহম্মেদ অয়নকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ঐ তিনি ছাত্রী জানান, তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অপসংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অতিরিক্ত পারিবারিক বিধিনিষেধের ফলে তারা পরিবারের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন বাসায় আবদ্ধ হয়ে থাকার সময় তারা পশ্চিমা সংস্কৃতি বিশেষ করে জাপানি সংস্কৃতির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন।

দুই মাস আগে তিন বান্ধবী তাদের বন্ধু তরিকুলের সঙ্গে দিয়াবাড়ী এলাকায় ঘুরতে যান। তখন হাফসা চৌধুরীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। আলোচনার এক পর্যায়ে তারা জাপানে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হাফসা চৌধুরী তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। তিন বান্ধবী হাফসার সঙ্গে পরিকল্পনা করে কক্সবাজার থেকে সাগরপথে জাপান যাবেন। সে উদ্দেশ্যে গত ৩০ সেপ্টম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় রিকশাযোগে প্রথমে গাবতলী যান। হাফসার পরামর্শে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে না পারে সে জন্য তারা  ফেইসবুক আইডি এবং ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি গাবতলীতে নষ্ট করে ফেলে। পরে তারা নৌকাযোগে নদী পার হয়ে আমিন বাজার এলাকায় পৌঁছালে হাফসার দুই লোক তাদেরকে একটি কালো প্রাইভেট কারে অজ্ঞাত স্থানে নামিয়ে দেয় এবং কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে রেলে চট্টগ্রাম যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু কমলাপুরে গিয়ে ট্রেন না পাওয়ায় তারা বাসযোগে কুমিল্লার ময়নামতি যায়। পথে নিজেদের পরিচয় গোপন করতে নিজেদের পোশাক পরিবর্তন এবং চুল কেটে ফেলে পশ্চিমা বেশ ধারণ করে। ময়নামতি পৌঁছে তারা দুটি মোবাইল ফোন কেনে। সেখান থেকে তারা বাসে করে চট্টগ্রাম পৌঁছে। তবে আত্মগোপনে থাকার জন্য তারা মোবাইলের সিম কেনেননি। কক্সবাজার পৌঁছে তারা ১-৫ অক্টোবর কক্সবাজার কলাতলীতে একটি হোটেলে অবস্থান করে। সিমের পরিবর্তে তারা ওয়াইফাই সংযোগ ব্যবহার করে। ২ অক্টোবর কক্সবাজার বিচ এলাকায় বেড়াতে গেলে হাফসার লোক পরিচয়ে আসিফ ও শফিক নামের দুই জন তাদের কাছ থাকা স্বর্ণালংকার ও কিছু নগদ টাকা নিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তারা আতঙ্কিত হয়ে হোটেলে অবস্থান নেয় এবং হোটেলের আশপাশের র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে ৫ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে বাসযোগে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর পৌঁছায়। গতকাল মিরপুর বেড়ীবাঁধ এলাকা থেকে ভোর ৬টার দিকে র্যাব-৪ তাদেরকে উদ্ধার করে র্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যায়।