দুটি ঘটনা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কারের ইতিহাসে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। তার মধ্যে একটি রয়েছে মৃত্যুর আগেই আলফ্রেড নোবেলের ‘মৃত্যু সংবাদ’ এবং অন্যটি হলো তার একটি ঘোড়ার গাড়ি। এসব ঘটনা স্পষ্ট করার আগে জানিয়ে রাখা ভালো, মৃত্যুর আগে আলফ্রেড নোবেল রেখে যান ৩১ মিলিয়ন ক্রোনার মূল্যের সম্পত্তি। আজকের দিনে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও কিছু বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। মারা যাওয়ার ঠিক এক বছর আগে একটা উইল করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আর সেই উইলের জন্যেই তিনি আজ বিশ্ববিখ্যাত। তাঁর নামাঙ্কিত নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।
কিন্তু কেন তিনি এমন উইল করেছিলেন? তার নেপথ্যে আছে একটি চমকপ্রদ ঘটনা। বলা যায় একটি বিশেষ উপলব্ধি। ঘটনাটি ঘটে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর ছয় বছর আগে। ১৮৮৮ সালের ১৫ এপ্রিল সকালে সংবাদপত্রে বড় বড় হরফে নিজের ‘মৃত্যু সংবাদ’ দেখে চমকে উঠলেন; শিরোনামে লেখা ‘মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীর মৃত্যু’। সেদিন আসলে মারা গিয়েছিলেন আলফ্রেড নোবেলের ভাই। পত্রিকাটি ভুল করে আলফ্রেডের ভাইয়ের মৃত্যুকে তাঁর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। কিন্তু পত্রিকার শিরোনামটি আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেলের মনে প্রচণ্ডভাবে দাগ কাটে। নোবেল বুঝতে পারেন, তিনি মারা গেলে পৃথিবী তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। তিনি নাকি মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করা মানুষ! নোবেল মনস্থির করলেন, তাঁকে তাঁর ভাবমূর্তি বদলাতেই হবে। তৈরি করতে হবে নতুন ভাবমূর্তি। বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী থেকে তিনি হয়ে উঠলেন মানবদরদি আলফ্রেড। কী-ই না করেছেন তিনি একা হাতে! তাঁর রয়েছে ৩৫৫টি আবিষ্কারের পেটেন্ট, লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, নাটক। ভিক্টর হুগোর ভাষায় তিনি ছিলেন ‘ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ভবঘুরে’।
ভবঘুরেই বটে। তাঁর মৃত্যুর পর এই ভবঘুরে ব্যাপারটি বেশ ঝামেলার সৃষ্টি করে। তিনি যে আসলে কোন দেশের নাগরিক, সেটা ঠিক করতে আদালতে মামলা পর্যন্ত গড়ায়। উইলে তিনি আত্মীয়দের জন্য প্রায় কিছুই রেখে যাননি। বরং উইলে একটি ফাউন্ডেশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। নোবেল ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের কাজ হবে প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিত্সাবিদ্যা, সাহিত্য আর শান্তির জন্য সেই বিষয়ের সেরা মানুষটাকে পুরস্কৃত করা। পদার্থবিদ্যা, রসায়নে পুরস্কারের দায়িত্ব নেবে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স, চিকিত্সাবিজ্ঞানের দায়িত্ব রয়্যাল ক্যারোলাইনা ইনস্টিটিউট আর সাহিত্যের জন্য দায়িত্বে থাকবে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
নোবেল তো উইল করে গেছেন। কিন্তু সুইডেন জানাল আলফ্রেড নোবেল আদৌ তাঁদের নাগরিকই নন। সুতরাং তাঁরা এই দায়িত্ব নেবে না। রাশিয়া, ফ্রান্স আর ইতালিও কোনো দায়িত্ব নিতে চাইল না। সুতরাং আলফ্রেড নোবেলের নাগরিকত্ব নিয়ে জট পাকিয়ে গেল। নোবেল জীবিত অবস্থায় বলে গিয়েছিলেন—‘আমি ঘরে বসে কাজ পছন্দ করি। আর সারা পৃথিবী আমার ঘর।’ সুতরাং নোবেলের নাগরিকত্ব নির্ণয় করতে মামলা উঠল ফরাসি কোর্টে। সে দেশেই আলফ্রেডের সবচেয়ে বেশি ভূসম্পত্তি ছিল। তর্ক-বিতর্কে আদালতে ঝড় বইল। অবশেষে ফরাসি একটি আইনের ধারা ঠিক করে দিল নোবেল আসলে কোন দেশের নাগরিক। সেই আইনের ধারায় বলা ছিল—কোনো মানুষ যেই দেশটিতে তাঁর নিজের ‘ঘোড়ার গাড়ি’ রাখেন, সেটাই তাঁর দেশ। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আলফ্রেড তাঁর ‘ঘোড়ার গাড়ি’টা সুইডেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে আইনের এই সূক্ষ্ম প্যাঁচে মৃত্যুর পরে তিনি সুইডেনের নাগরিক হয়ে গেলেন।
আলফ্রেডের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল ডিনামাইট। তিনি ও তাঁর ভাই এমিল অনেকদিন ধরেই বিস্ফোরক পদার্থ নাইট্রোগিসারিন নিয়ে গবেষণা করতেন। একদিন গবেষণাগারে এই নাইট্রোগিসারিনের বিস্ফোরণে মারা যান আলফ্রেডে ভাই এমিল। সেসময় ইউরোপে ব্লাস্টিং অয়েলের ভীষণ চাহিদা। জার্মানি আর স্কটল্যান্ডে কারখানা খুললেন আলফ্রেড। মুশকিল হলো, গরম কিছুর সংস্পর্শে এলে বা ধাক্কা লাগলেই নাইট্রোগিসারিনে বিস্ফোরণ ঘটে শ্রমিকদের মৃত্যু ঘটত। ১৮৬৬ সালে জার্মানির ক্রুমেলে গিয়ে তাঁর জীবনের বাঁক বদলে যায়। সেখানকার মাটিতে এক অদ্ভুত ধরনের সছিদ্র বালি দেখতে পান নোবেল। তাঁর মাথায় আচমকা এক বুদ্ধি খুলে যায়। আদিপ্রাণী ডায়াটমের দেহাবশেষ এই বালি দিয়ে পুট্টি বানিয়ে তার মধ্যে নাইট্রোগিসারিন ভরে দেওয়ার পর দেখা গেল—সেটা ধাক্কা খেলে এমনকি গরম করলেও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্ফোরিত হচ্ছে না। একমাত্র আলফ্রেডের ব্লাস্টিং ক্যাপ দিয়ে ডিটোনেট করলেই সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ফাটবে সেটা। এটাই তো এত দিন চাইছিলেন নোবেল! ১৮৬৭ সালে এই নতুন বিস্ফোরকের পেটেন্ট নিলেন আলফ্রেড। গ্রিক শব্দ ‘ডুনামিস’, যার অর্থ প্রবল শক্তি, সেখান থেকেই এই নতুন আবিষ্কারের নাম দিলেন ‘ডিনামাইট’। বাকিটা ইতিহাস।
নোবেলের হূদযন্ত্রের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এজন্য তাঁকে নাইট্রোগিসারিন খেতে হতো। নোবেল একটি চিঠিতে লিখেছেন—‘ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যেই নাইট্রোগিসারিন আমাকে এত কিছু দিল, এখন নিজের হূদযন্ত্র সারাতে সেটাই আমাকে খেতে হবে! চিকিত্সকরা শুধু নামটা বদলে ‘ট্রাইনাইট্রিন’ করে দিয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ ভয় না পায়।’
আলফ্রেড নোবেল বলতেন—‘আমার মাথায় হাজার হাজার আইডিয়া কাজ করছে। এর একটা কাজ করলেই আমি খুশি।’ মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করা মানুষটি মৃত্যুর পর নিজেকে বিশ্বের এক পরম কল্যাণময় ব্যক্তিত্বে পরিণত করলেন। আমূল বদলে ফেললেন তার ভাবমূর্তি। শুধু একটি আইডিয়ার জোরে। প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হয়। শুরু হয় চিকিত্সাবিজ্ঞান দিয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হলো সাহিত্যে নোবেল বিজেতার নাম।
[ লুইসিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র ]
