ফরহাদ খান বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিশুদ্ধ প্রাণ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:৩৩

গত ১ অক্টোবর চলে গেলেন লেখক গবেষক ফরহাদ খান। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধবাদী। শব্দের উত্স সন্ধানে তিনি যেমন অনুসন্ধিত্সু ছিলেন, তেমনটি সঠিক উচ্চারণের বিষয়েও ছিলেন সচেতন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ক ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করতেন। তাঁর কারণেই অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বাংলা ব্যাকরণ, উচ্চারণ ও বানানরীতি নিয়ে আলোচনা হতো। আমি নিজে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ ও প্রবাসে বাংলা সাহিত্য চর্চা বিষয়ে বক্তা হয়ে গেছি কয়েকটি পর্বে। লক্ষ করেছি, কথা বলার সময় অকারণে কোনো ইংরেজি শব্দ চলে এলে সেগুলো তিনি সম্পাদনা করে দিতেন।

বহু বিষয়ে পণ্ডিত মানুষ ছিলেন, ফলে আলোচনা উসকে দিয়ে মনোযোগী শ্রোতার মতো বসে থাকতেন। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যে বিনয় সেটিও তাঁর উত্তর প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে কলকাতার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কবীর সুমন যথার্থই লিখেছেন—‘এ জীবনে হাতেগোনার চেয়েও কম সংখ্যক যে কজনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে প্রকৃত বাঙালি কাকে বলে বুঝতে পেরেছি ইনি (ফরহাদ খান) তাঁদের একজন। ১৯৯৬ সালে কোলোন শহরে ভয়েস অফ জার্মানির বাংলা বিভাগে চাকরি করতে গিয়ে এই মানুষ বাঙালিটির সঙ্গে বন্ধুতা হয়েছিল। যে অতি অল্প কজন বাঙালিকে দেখে জানতে পেরেছি আধুনিক শিক্ষিত মরমি বাঙালি কাকে বলে ফরহাদ তাঁদেরই একজন।’

ফরহাদ খান লেখালেখি করতেন সত্তরের দশক থেকে। প্রথম প্রকাশিত বই ‘প্রতীচ্য পুরাণ’, প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৮৪ সালে। গ্রিক রোমক, স্ক্যান্ডিনেভীয়, টিউটোনিক, ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় প্রাচীন সাহিত্য ও পুরাণের আলোচিত চরিত্র, স্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন লেখকের পরিচিতি সম্বলিত বইটি দিয়েই তিনি তাঁর বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহের দিকটি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। বিশ্বপুরাণের অভিধানস্বরূপ বইটি পাঠকমহলে আদৃত হয়। এরপর তিনি শব্দের উত্স ও অর্থ সন্ধানে ব্রতী হন। তাঁর প্রকাশিত ‘প্রতীচ্য পুরাণ’, ‘শব্দের চালচিত্র’, ‘বাংলা শব্দের উত্স অভিধান’ ও ‘হারিয়ে যাওয়া হরফের কাহিনী’ গ্রন্থ চারটি বাংলা ভাষা চর্চায় অমূল্য সংযোজন। এছাড়াও ‘অ্যাকাডেমিক শিরঃপীড়া’, ‘ব্যুরোপ্যাথি ও অন্যান্য’, ‘চিত্র ও বিচিত্র’, ‘হারিয়ে যাওয়া বেদের কাহিনী’, ‘বাঙালির বিবিধ বিলাস’, ‘অরণ্যে বিশ্বাসের বলি ও অন্যান্য’ প্রভৃতি গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আমরা বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহী ফরহাদ খানকে পাই। তিনি সৃজনশীল মানুষ ছিলেন, সৃজনশীল সাহিত্যচর্চায় খুব বেশি নিয়মিত হননি। তার প্রয়োজনও হয়নি, কেননা তিনি তাঁর প্রবন্ধ-সাহিত্যের ধারাকে সৃজনশীল সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি ফ্যাক্টসকে সাধুগদ্যে ফিকশনের আদলে এমনভাবে সরসভাবে উপস্থাপন করতেন যে তাঁর প্রতিটা লেখা সব ধরনের পাঠকের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠত।

প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক-উপস্থাপক হিসেবে অনেকের জন্য অনুকরণীয় ছিলেন ফরহাদ খান। কর্মজীবনে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। মাঝখানে ডেপুটেশন নিয়ে জার্মানির কোলন শহরে অবস্থিত ডয়চে ভেলে-তে তিন বছর কাজ করেছেন বাংলা বিভাগের সম্পাদক হিসেবে।