নিজেকে নিজে ধোঁকা দেওয়া কেন?

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২১:৫৬

উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি। একটি দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবেশ করিলে তাহা এক দমবন্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়া থাকে, যাহা হইতে মুক্তি পাইতে দেশের আপামর জনসাধারণ উন্মুখ হইয়া থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বের এমন অনেক দেশই রহিয়াছে, যেই সকল দেশের তৃণমূল হইতে হিমালয়ের চূড়া অবধি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। দেখা যায়, সেই সমস্ত দেশে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন তাহাদের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের চারিপাশে এমন সকল মানুষজন বসিয়া থাকেন যাহারা রাজনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, নীতিনির্ধারণ ইত্যাদিতে প্রভাব বিস্তার করে। বলাই বাহুল্য, দুর্নীতির বড় বড় প্লট তাহারাই রচনা করিয়া থাকে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি সংস্থা থাকিলেও এবং দেশব্যাপী তাহাদের অফিস বিস্তৃত হইলেও তাহা দুর্নীতি প্রতিরোধের বেলায় কেবল প্রহসনই সৃষ্টি করিয়া থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক এই সকল সংস্থা সরকারের অর্থের অপচয় ব্যতীত আর কোনো কাজে আসিতেছে না। উন্নয়নশীল বিশ্বের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাহারা থাকেন তাহারা দেশের সকল অন্যায়, অপকর্ম, দুর্নীতি সংঘটনকারীদের দেশবিরোধী আখ্যা দিয়া থাকেন, অথচ কাহারা তাহাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়া থাকেন—সেই প্রশ্ন কি প্রাসঙ্গিক নহে?

আমরা দেখিতে পাই উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি সকল জায়গাতেই এক শ্রেণির মানুষ ব্যাপক সুবিধাভোগী হইতেছে, তাহারা দুর্নীতি করিয়া অর্থসম্পদের মালিক হইতেছে। অথচ যাহাদের দেশদ্রোহী, দেশবিরোধী বলিয়া আখ্যা দেওয়া হয় তাহারাই প্রকারান্তরে সরকারের ঘনিষ্ঠজন সাজিয়া লুটপাট করিয়া বেড়ায়। সেই সকল দেশের সরকার পরিচালনায় যাহারা থাকেন তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, ইহারা সিঁধ কাটিতে আসিয়াছে। সরিষার মধ্যে ভূত লুকাইয়া থাকার কথা আমরা শুনিয়াছি, এই সকল লোকও সরকারের মধ্যে থাকা ভূত বই কিছুই নহে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের সরকার নিজ দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতির কথা গর্বের সহিত প্রচার-প্রচারণা করিয়া থাকে বটে; কিন্তু দেশে আকণ্ঠ নিমজ্জিত দুর্নীতি তাহাদের কথা আর কাজের ফারাক—চোখে আঙুল দিয়া তাহা দেখাইয়া দেয়। সাধারণ মানুষের সহিত কথা বলিলে তাহারা সেই সকল দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের দুর্নীতি হইতে শুরু করিয়া সরকারি অফিসের টেবিলে টেবিলে ঘুষ-উপরির কাহিনি ব্যক্ত করিয়া হতাশা প্রকাশ করেন। উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তাহারা হয়তো মনে করিয়া থাকেন, নগদ যাহা পাও হাত পাতিয়া লও, বাকির খাতায় শূন্য থাকুক! মনে রাখিতে হইবে, অন্যকে ধোঁকা দিয়া সাময়িক লাভবান হওয়া যায় বটে; কিন্তু নিজেকে নিজে প্রতারিত করিলে তাহার ফল কখনোই শুভ হয় না। সুতরাং উন্নয়নশীল বিশ্বে বিভিন্ন পদপদবিতে যাহাদের বসানো হয় তাহাদের প্রথম নিজেদেরকেই চিনিতে হইবে। নিজেকে চিনিতে না পারিলে কখনোই দেশ এবং দেশের মানুষকে চেনা যায় না। নিজেকেই নিজের প্রশ্ন করিতে হইবে—আমি কে? আপাতদৃষ্টিতে নিজেকে জানিবার এই প্রশ্নটি সহজ ও সাধারণ মনে হইলেও যেই পর্যন্ত নিজেকে চিহ্নিত করা যাইবে না, সেই পর্যন্ত তাহাদের দিয়া ভালো কিছুও আশা করা যাইবে না।

সুতরাং উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রহিয়াছেন এবং তাহারা যাহাদের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদপদবিতে বসাইয়া থাকেন তাহাদের প্রত্যেককেই নিজেদের চিনিতে হইবে, নিজেদের জানিতে হইবে। নিজেদের যোগ্যতা, গুণ এবং বিশেষ করিয়া পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করিতে হইবে। যাহারা শ্রম দেয় এবং চেষ্টা করিয়া যায় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও তাহাদের খালি হাতে ফিরাইবেন না বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন।