ব্যবসায়ীদের জীবন ওষ্ঠাগত

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২২:০০

দেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্বনির্ভরতা অর্জন, সড়ক, সেতু ও স্থাপনা নির্মাণসহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবসায়ী সমাজের অবদান ব্যাপক। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয় দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য। প্রকৃতপক্ষে সরকারি কর্মচারীদের দ্বারা দেশ ও জনগণ কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন তা দেশবাসীর অজানা নয়। তবে ব্যবসায়ী হিসেবে সরকারি কর্মচারীরা সফল নয়। সরকারি পরিবহন চালায় সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিআরটিসি। বিআরটিসি পরিচালনা করেন সরকারি কর্মচারীরা। এই বিআরটিসির জন্য সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও লাভ তো দূরের কথা, বিআরটিসির কাছে শুধু ব্যাংকেরই পাওনা ১ হাজার কোটি টাকারও ওপরে। বিআরটিসির সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয় সরকারি কোষাগার থেকে। এদিকে বেসরকারি পরিবহনগুলোর বিলাশবহুল বাস, সেবা ও গুণমানের আশপাশে কি বিআরটিসির অবস্থান অনেকটা বেমানান নয়? বেসরকারি পরিবহনে সরকার একটি টাকাও ব্যয় করে না, উপরন্তু বেসরকারি পরিবহনগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ট্যাক্স ও ভ্যাটের মাধ্যমে সরকারকে দিয়েই যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি জনগণ যাতায়াত করে থাকেন বেসরকারি পরিবহনগুলোতেই।

বাংলাদেশ সরকারের অধীনে সরকারি সব বিভাগে সর্বসাকুল্যে শতকরা এক ভাগেরও কম অর্থাত্ ১৬ লাখ লোক সরকারি চাকরি করেন। অথচ কোটি কোটি লোক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় চাকরি করেন। কৃষক যেটা উত্পাদন করেন সেগুলোও কেনাবেচা, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত ব্যবসায়ীরাই করেন। বিদেশে লোক প্রেরণ করেন ব্যবসায়ীরাই। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, রড, ফার্নিচার, পত্রিকা ও মিডিয়াসহ হাজারো ধরনের ব্যবসা ও ইন্ডাস্ট্রিগুলো চালান ব্যবসায়ীরাই। সরকার আজ পর্যন্ত কয়টি ভবন নির্মাণ করেছে? অথচ লাখ লাখ বাসভবন ও নগরায়ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই করে চলেছে। এসব খাতে সরকার একটি টাকাও ভর্তুকি দিচ্ছে না। অথচ এসব খাত থেকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে এবং দেশের জনগণ উপকৃত হওয়াসহ নগরায়ণ ও দেশের উন্নয়ন করে চলেছেন দেশের ব্যবসায়ীগণ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি কোটি লোক চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

এদিকে জনগণের নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সরকারের সব মন্ত্রণালয়, সেনা, নৌ, বিমান, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, ভিডিপি, দমকলসহ সব বাহিনী, জাতীয় সংসদ, করপোরেশন, অধিদপ্তর, দপ্তর, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলখানা, আইন-আদালত, হাসপাতালসহ যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে—সবগুলোই হচ্ছে খরচের খাত। এসব খাতে প্রতি বছর শুধু ব্যয়ই হয় লাখো হাজার কোটি টাকা। এসবের যোগান দেন ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণ; কিন্তু অক্টোপাসের মতো চারিদিক থেকে তাদেরকেই শোষণ, নির্যাতন ও হয়রানি করেই চলেছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের একশ্রেণির কর্মচারীরা। যেই ব্যবসায়ীরা দেশ ও জনগণের জন্য ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাদের ওপর সরকারি ট্যাক্স, ভ্যাট, একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মাস্তানদের চাঁদাবাজিতে ব্যবসায়ীদের জীবন ওষ্ঠাগত।

সরকারি এমন কোনো দপ্তর নেই যেখানে ঘুষ ছড়া কাজ হয়। এমনকি বিচার বিভাগও এর ব্যতিক্রম নয়। আদালত একজনকে জামিন দিলে কী হবে, যদি ঘাটে ঘাটে ঘুষ দেওয়া না হয়—তাহলে এক সপ্তাহ নয়, এক মাসেও জামিন পাওয়া ব্যক্তিটি জেল বা হাজত থেকে বের হতে পারবে না এটাই বড় বাস্তবতা। আবার আজই একজন জামিনের আদেশ পেয়ে আজই জেলখানা থেকে বেরিয়ে যায় শুধু ঘাটে ঘাটে ঘুষের টাকা পৌঁছে দেওয়ার বদৌলতে। জেলখানার সামান্য একজন জেলার কোটি কোটি টাকা কামাই করছেন। অথচ এদের দেখার, বলার ও করার কেউ নেই। কেউ এর প্রতিবাদ করলে সবাই একত্রিত হয়ে সত্ কর্মচারীকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে বারটা বাজিয়ে তাকে শুধু চাকরিচ্যুতই নয়, তাকে জেলে পুরেই ছাড়বে। এই যদি দেশের বাস্তব, সত্য ও প্রকৃত চিত্র হয়; তাহলে সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অবস্থা কী—তা সহজেই অনুমেয়। শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের হত্যা করা হলেও তার পরিবার সুবিচার পাচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এই দেশটিকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। তার সুযোগ্য কন্যা দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, ফল ও স্বীকৃতিও পাচ্ছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে; কিন্তু একনাগারে ১২ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় যতটুকু আর্জন করা উচিত ছিল ততটুকু অর্জিত হয়নি। চাটুকাররা যতই উন্নতির জোয়ারের কথা বলুক না কেন, সরকারি কর্মচারীরা পাল্লা দিয়েই দেশটিকে দুর্নীতির সাগর সৃষ্টি করে চলেছেন—তার হিসাবও সরকারের নিশ্চয়ই জানা রয়েছে। সরকারের উন্নয়ন ও কর্মকাণ্ডগুলো ম্লান ও ধূলিসাত্ করে দিচ্ছে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতা।

যে সন্তান সত্, কর্মঠ ও রোজগার করে তাকেই পিতামাতা ও অন্যরা একটু বেশি আদর-যত্ন করে ও ভালো চোখে দেখে, এটাই স্বভাবিক। অথচ আমাদের ব্যবসায়ীদের ওপরেই অতিমাত্রায় প্রতিনিয়ত নিষ্পেষণ ও হয়রানি চলছেই। দেশের স্বার্থেই এসবের সুরাহা হওয়া এখন সময়ের দাবি।

n লেখক :সিনিয়র আইনজীবী ও চেয়ারম্যান,

ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটি