বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সংক্রামক রোগ বাড়ছে। এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসংক্রান্ত এক গবেষণায় এ তথ্য উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। সে সময় সারা দেশে ডেঙ্গু রোগী মৃত্যুর ৭৭ শতাংশ হয়েছিল ঢাকাতে। ঐ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় তিন গুণ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ছিল রেকর্ড পরিমাণে। বাতাসে আর্দ্রতা গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ থাকলে ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই আবহাওয়া ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য সহায়ক।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি নিয়ে ওয়েবিনারের আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক। এতে জানানো হয়, গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাস, পানিবাহিত এবং মশাবাহিত রোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার একটি যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৪৪ বছরে বাংলাদেশের তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব বেড়েছে। শীতকালের স্থায়িত্ব কমে এসেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে ঋতু বৈচিত্র্য কমে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে।
আবহাওয়ার সঙ্গে সংক্রামক রোগের বিস্তার তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমের তুলনায় বর্ষা মৌসুমে দেশে সংক্রামক রোগের বিস্তার অন্তত ২০ শতাংশ বেশি লক্ষ্য করা গেছে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গেও অসুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে অসুখ-বিসুখ গড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ১ শতাংশ আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে সংক্রামক রোগ দেড় শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনের সহ লেখক বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অপারেশনাল অফিসার ইফফাত মাহমুদ উল্লেখ করেন, উন্নত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোকে আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত তথ্য এবং স্বাস্থ্যগত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এর মাধ্যমে সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং ডেঙ্গু সতর্কীকরণ বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা বাড়তে দেখা যায়। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ব্যাধিও বৃদ্ধি পায়। তবে মানসিক বিষণ্নতায় পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ভোগে। উদ্বেগের প্রভাব তুলনামূলক পুরুষের মধ্যে বেশি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রামক এবং অন্যান্য জলবায়ুু-সংবেদনশীল রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের দলগত উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলো আরো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সহায়তা করবে। এতে আলোচনায় অংশ নিয়ে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এ গবেষণা তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টিমবন উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে মোকাবিলা করেছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হচ্ছে এবং কৃষি উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য দেশীয় পদ্ধতিতে সমাধান চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এই সফলতা শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে কাজে লাগাতে হবে, যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংক্রমণ এড়ানো যায়।
