বিশ্বব্যাপী নানান মাত্রার অস্থিরতা ক্রমশ মাকড়সার জালের মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে। কোথাও যুদ্ধবিমান উড়িতেছে, কোথাও খাদ্য ও অর্থের আকাল দেখা যাইতেছে। বলা যায়, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক অস্থিরতা হইতে কোনো দেশই এখন আর মুক্ত নহে। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ দিয়া। আর তাহার পর সতর্ক করিয়াছেন বাড়াবাড়ি না করিতে। এক জনকে আরেক জনের মতো হইবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখিবার বিষয়েও স্পষ্ট নিষেধ করা হইয়াছে। প্রত্যেকেই তাহার কর্ম অনুযায়ী ফল পাইবে। কাহারো কর্মই বৃথা যাইবে না। ভালো কর্মের ভালো ফল এবং খারাপ কর্মের খারাপ ফল মিলিবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি। যাহারা পায়ে পাড়া দিয়া ঝগড়া বাধাইতে চাহে, তাহারা আসলে পানি ঘোলা করিয়া মত্স্য শিকারের মতলবে থাকে। এই মতলববাজ মোড়লদের জন্যই পৃথিবীতে আজ এত অশান্তি। যুদ্ধ ও অশান্তিকে তাহারা পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করে। এই জন্য মোড়লদের নিকট ‘যুদ্ধ’ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়। এই ব্যবসায়ের জন্যই বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক দেশে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করিতেছে। তৈরি হইয়াছে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। এককালে যাহাদের অঢেল প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধ জীবন ছিল, তাহাদের আজ পথের ভিখারি বানানো হইতেছে। আমরা দেখিতে পাইয়াছি, সন্ত্রাসবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের নামে পেট্রো-ডলারের সুবিধাকে ব্যবহার করিয়া ন্যাটো এবং কিছু আরব দেশ ও তাহাদের ইউরোপীয় মিত্ররা কী না করিতেছে! অন্যদিকে, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব নব নবরূপে এবং নূতন স্বীকৃতির মাধ্যমে আরো প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে। একটি জাতিগোষ্ঠীকে তিলে তিলে শেষ করা হইতেছে স্লো পয়জনের মতো। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হইল, নিজ নিজ ভূখণ্ডে ‘মানবতার ধারক’ এই পরাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ অন্য রাষ্ট্রের কিছু কিছু জাতিগোষ্ঠীর উপর দমনপীড়ন ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাইবার ঢালাও অনুমোদন দিতে দ্বিধা করে না!
আমরা ইহাও দেখিতেছি যে, পরাশক্তিদের মতানুযায়ী যদি কোনো জাতি চলিতে না চাহে, তখন তাহাদের খাদ্যে-পানিতে মারিবার ব্যবস্থা করা হয়। এখন কোনো জাতিকে খাদ্য পয়সায় যদি পঙ্গু করিবার ব্যবস্থা করা হয়, তখন ঐ দেশটিকে খাদ্য-অর্থ পাইতে হইলে মোড়লদের নিকট হাত পাতিতেই হইবে। ইহাই তো মোড়লেরা চাহে! ইহাও তাহাদের আরেকটি ফাঁদ। অথচ এই অর্থ প্রদানের বিনিময়ে মোড়লরা সেই দেশটির নিজস্ব ধর্ম সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষার পরিবর্তনও করিতে চাহে। এখন প্রশ্ন হইল—উন্নয়নশীল বিশ্ব যদি মোড়লদের দান-খয়রাত-ঋণ না গ্রহণ করে, তাহা হইলে কী এমন ক্ষতি হইবে? মোড়লরা তো দুই পয়সা ধার দিয়া তিন বেলা কিলাইতে চাহে। যাহা দিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহা দিতেও তাহারা নানা ধরনের টালবাহানা করে, সময় প্রলম্বিত করে। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ভাবিতে হইবে, তাহারা আসলে কী চাহে। তাহারা নিজেদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অধিকার লইয়া স্বকীয় জীবন যাপন করিতে চাহে, নাকি একবার এক মোড়লের পায়ের তলা হইতে গড়াইয়া আরেক মোড়লের পায়ের তলায় পদদলিত হইতে চাহে?
বস্তুত, জনগণের করের পয়সায় যাহারা মোড়লগিরি করিয়া থাকে, তাহারা যদি এই পয়সা পৃথিবীর মঙ্গলের কাজে ব্যবহার করিত, তাহা হইলে পৃথিবীতে কেহ না খাইয়া থাকিত না। সুতরাং আয়নায় নিজেদের মুখ দেখিতে হইবে জগতের কথিত মোড়লদের। তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, অন্যকে ধ্বংসের আগুন ঝলসাইলে সেই আগুনের আঁচ একটি পর্যায়ে নিজেদের গায়েও পড়িতে বাধ্য। ইহার চাইতে তাহারা নিজেরাও শান্তিতে থাকুক এবং অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিক।
