প্রাথমিকে একটাই কারিকুলাম চাই

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩১

গবেষণা ও বিজ্ঞান বলছে, নয় বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি শিশু একসঙ্গে চারটি ভাষা রপ্ত করতে পারে। সাধারণত আওয়াজ বা ধ্বনি শুনেই শিশুরা ভাষা শেখে। ভাষা শেখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জরুরি না। কেবল আওয়াজ শুনে শুনেই পাঠ্যপুস্তক পড়ার আগেই শিশুরা বাবা-মা-দাদা-নানা এসব বলতে শুরু করে। এবং ধীরে ধীরে শিশু নানারকম বাক্য বলাও শিখে যায়, শুধু ধ্বনি শুনে শুনে। যেমন, ‘মা, খিদা লাগছে, ভাত দাও’—এ বাক্য বলার জন্য কোনো শিশুকেই বই পড়তে হয় না। এটা প্রাকৃতিকভাবেই হয়। শুনে শুনে শেখার এই ব্যাপারটা চলতে থাকে শিশুর নয় বছর বয়স পর্যন্ত। অর্থাত্ শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত।

এই নয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে আরেকটা বিষয় ঘটে। সেটা হলো মাড়ি বা চোয়ালের গঠন ও স্থায়ীকরণ। শব্দের সঠিক উচ্চারণ করার সময় মাড়ি বা চোয়ালের গঠন ও স্থায়ীকরণ অনেক বড় ভূমিকা রাখে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ‘প্র’ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের উচ্চারণ করতে বাংলাদেশের একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের অনেক সমস্যা হয়। এটা ঘটে মাড়ি বা চোয়ালের গঠন ও স্থায়ীকরণের কারণে। শিশুর নয় বছর বয়সের মধ্যেই মাড়ি ও চোয়াল জায়গামতো সেট হয়ে যায়। এরপর মাড়ির আর কোনো পরিবর্তন হয় না। শিক্ষার্থী ‘থিরি’ বলবে না ‘থ্রি’ বলবে, এটা নয় বছরের মধ্যেই ফিক্সড হয়ে যাবে।

এই নয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর মনন ও মস্তিষ্ককে আমরা ‘ভেজা নরম এঁটেল মাটির বল’ মনে করতে পারি। নরম এঁটেল মাটির সেই বলকে যে কোনো আকৃতি দিতে সমস্যা হবে না। কিন্তু নয় বছর পার হয়ে গেলে শিশুর মন ও মস্তিস্ক হয়ে যাবে ‘শুকনা শক্ত এঁটেল মাটির বল’, যার আকৃতি পরিবর্তন করতে গেলেই বলটি ভেঙে যাবে। নয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে যা শেখানো হয়, তাই তার মেমোরি সেলে সারা জীবনের জন্য গেঁথে যায়। এই সময় কোনো শিশুকে যদি শেখানো যায়, ‘মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে একটা বিরাট বিস্ফোরণের মাধ্যমে। সৃষ্টির পর থেকে মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণশীল। পৃথিবী হলো মহাবিশ্বের একটা ক্ষুদ্রতম গ্রহ। মানুষ প্রতিনিয়ত মহাবিশ্বের অজানা তথ্য আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। বিজ্ঞান মানুষের জীবনে আর্শীবাদ। একদিন মানুষ পৃথিবীর বাইরে অন্যগ্রহে বসবাস করবে’, এটা শিশুর ব্রেনে গেঁথে যাবে।

সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আমাদের সন্তানের মনন ও মগজে কোন শিক্ষাটা গেঁথে দেবো? পারলৌকিক ও অদৃশ্য কাল্পনিক বিষয় নাকি বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবন? এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক শিক্ষা হলো জাতির ফাউন্ডেশন। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে জাতির ভবিষ্যত্। অথচ বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা চরমভাবে অবহেলিত। গত দশ বছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামোর অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু প্রাইমারি স্কুলে ভালো শিক্ষকের অভাব এখনো ভীষণ প্রকট। প্রাথমিকের শিক্ষকই হলো, ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। মানুষ গড়ার কারিগরদের সামাজিক স্বীকৃতি নাই, মর্যাদা নাই। দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো সম্মানজনক ছিল না। তবে বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন কাঠামো সম্মানজনক পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে। আর অনেকদিন ধরেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে চলেছে নানা ধরনের গবেষণা। শিশুরা যেন গিনিপিগ! বাংলাদেশে প্রাইমারি স্কুলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা ছাড়াও রয়েছে এতিমখানা, ক্যাডেট মাদ্রাসা। আমার কথা হচ্ছে, উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য সারা দেশে প্রাথমিক স্তরে কেবল একটাই শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা উচিত। অর্থাত্ ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত শুধু জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পড়াশোনা করতে হবে।

ঢাকা