‘টাকার কাছে আমরা অসহায়’

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২২:৩৩

 ‘আমি তারানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমার কমিটির মেয়াদ এখনো অনেক বাকি। কিন্তু আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই কথিত সম্মেলনের নামে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে একজনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এমপির (ঢাকা-২ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি কামরুল ইসলাম) সরাসরি মদতেই সবকিছু হচ্ছে। মাদকসেবী, মাদক কারবারি, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা টাকার বিনিময়ে পদ কিনে নিচ্ছে। দলের পদ এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনকে সামনে রেখে চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার পদে মনোনয়নের সুপারিশের বিষয়টি যেন নিলামে তোলা হয়েছে এখানে। টাকার কাছে আমরা অসহায়।’

গত সোমবার ঢাকায় কয়েক জন সাংবাদিকের কাছে এভাবেই বলছিলেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন তারানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ফারুক। কয়দিন আগ পর্যন্ত তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার অভিযোগ, তার কমিটির মেয়াদ থাকলেও থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি এই ইউনিয়নে নতুন কমিটি করেছে। কমিটি গঠনের জন্য সম্মেলন ডাকা হলেও তাকে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাকে চিঠি দিয়ে জানানোও হয়নি।

গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে মোশাররফ হোসেন ফারুক বলেন, ‘১৯৭৫-এর পর এখানে আওয়ামী লীগকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল। বিএনপির আমান উল্যাহ আমান এখানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। সেখান থেকে আমরা এখানে আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছি। সেই আওয়ামী লীগে আজ এখানে টাকার বিনিময়ে নিম্নমানের কমিটি করা হচ্ছে। কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’

একই অভিযোগ কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কলাতিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আহসান টিপুরও। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমি কলাতিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। বেআইনিভাবে সম্মেলন করে এখানেও নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে, সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে রনিকে। রনির বাবা আওয়ামী লীগ করতেন। রনিকে দুই-তিন বছর যাবত্ আওয়ামী লীগে দেখছি, এর আগে কখনো দেখিনি।

আহসান টিপু বলেন, ‘সবকিছুর মূলে স্থানীয় এমপি। ভূমিদস্যু, মাদক কারবারিরা ও স্থানীয় বিতর্কিত লোকজন তার চারপাশ ঘিরে থাকে। যাদের নিয়ে নতুন কমিটি করা হয়েছে তাদের বেশির ভাগই মাদকসেবী, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী; তারা আগে বিএনপি, জামায়াত ও গণফোরামে ছিলেন।’ আহসান টিপু আক্ষেপ করে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। আজ আমরা এখানে যেন বিরোধী দল। যতসব খারাপ লোকজন নিয়ে কমিটি করা হচ্ছে।’

অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা-২ আসনের এমপি কামরুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সব মিথ্যা কথা। ৫, ৬, ৭ বছর ধরে সম্মেলন হয়নি—এমন স্থানে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে। যারা বাদ পড়েছে তারা এখন ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদের বিএনপি, জামায়াত কিংবা গণফোরাম বানাচ্ছে। আর ভূমিদস্যু কিংবা সন্ত্রসীদের কথা যদি বলেন তাহলে তাদের মূল হোতা কারা সেটা বের করতে হবে। এসব অভিযোগ তারা আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদকের (ওবায়দুল কাদের) কাছেও করেছিল। সাধারণ সম্পাদক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, পরে আমি তাকে প্রকৃত ঘটনা বলেছি।’

জানা গেছে, ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কমিটি হয়েছিল। কিন্তু কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে বিভিন্ন ইউনিয়নে ও ওয়ার্ডে নতুন করে যেসব কমিটি করা হচ্ছে তাতে স্থানীয় চি?ি?হ্নত ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতরাও স্থান পাচ্ছেন। অতীতে কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না; বরং বিএনপি, জামায়াত ও গণফোরামসহ অন্য দলে ছিলেন—এমন ব্যক্তিরাও টাকার বিনিময়ে পদ পাচ্ছেন। জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৬৩টি ওয়ার্ডের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ডের মেম্বার পদে মনোনয়নের সুপারিশ করার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদেরও মনোনয়নের সুপারিশ করার প্রক্রিয়া চলছে। মূলত ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখেই বাণিজ্যের লক্ষ্যে দলের প্রকৃত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের দলে পদবি দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা কষ্টে দলত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের এবং বিএনপি-জামায়াতের লোকদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আমি নিজেই ব্যবস্থা নেব।’

মোশাররফ হোসেন ফারুক ও আহসান টিপুর মতো একই ঘটনা ঘটেছে হযরতপুর ইউনিয়নেও। এই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন আনোয়ার হোসেন আয়নাল। মেয়াদ থাকার পরেও তাকে বাদ দিয়ে আলাউদ্দিনকে সভাপতি ও আরিফুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। আনোয়ার হোসেন আয়নাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘২০২৩ সাল পর্যন্ত আমার কমিটির মেয়াদ রয়েছে। আরিফ একসময় বিএনপি করত। আলাউদ্দিনও বিএনপি ছেড়ে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগে এসেছে। সবই করা হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। এখানে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতেই এসব করা হচ্ছে। আমি আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমাকে বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে হাইব্রিড কাউকে করার চেষ্টা চলছে।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৪ অক্টোবর  সিরাজগঞ্জ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এক সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের মনোনয়নের জন্য জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য মানুষের নাম পাঠান। টাকা খেয়ে খারাপ লোকের নাম  কেন্দ্রে পাঠাবেন না।’ কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের এই আহ্বানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগে। সাক্তা ইউনিয়ন পরিষদেও বিপুল অর্থের বিনিময়ে চেয়ারম্যান পদে স্থানীয় একজন শীর্ষ ভূমিদস্যুকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারানগরেও একই ঘটনা ঘটছে, এই লক্ষ্যে মোশাররফ হোসেন ফারুককে বাদ দিয়ে মুক্তার হোসেনকে তারানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়েছে।

কালিন্দী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হুমায়ুন গনি। তার অভিযোগ, তার কমিটির মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও নতুন কমিটির মাধ্যমে হাজী এহসানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এহসান আগে গণফোরাম করতেন।

উদ্ভূত অভিযোগসমূহ সম্পর্কে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক শফিউল আজম বারকু ইত্তেফাককে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ইউপি নির্বাচনের তফসিল এখনো হয়নি। আর মেয়াদ থাকার পরেও কয়েকটি ইউনিয়নের কমিটি ভেঙে দেওয়ার যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা পুরোপুরি ঠিক নয়।’