মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২১, ২২:০১

প্রতিটি মানুষের যেমন দৈহিক স্বাস্থ্য আছে, তেমনি মনেরও স্বাস্থ্য আছে। বাস্তব জীবনে ইতিবাচক আবেগীয় অবস্থা ও মানসিক তৃপ্তি লাভের মধ্য দিয়ে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে, তাই প্রত্যেক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। পৃথিবীর সবার মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতার দিন হিসেবে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছরের ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘অসম বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য’।

ডব্লিউএইচও মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যাখ্যা করে মানসিক সুস্বাস্থ্য হিসেবে মত দিয়েছে যে, মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান একজন মানুষ তার নিজের ক্ষমতা বুঝতে পারে, জীবনের স্বভাবিক চাপসমূহের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে এবং সমাজের সর্বস্তরে অবদান রাখতে পারে। মানুষ যে কোনো সময় শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। শরীরের সঙ্গে মনের একটি আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না। পরিবেশের বিভিন্ন উদ্দীপকের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে আমাদের মন কখনো কখনো উত্ফুল্ল এবং কখনো দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই সব সময় মানসিক দিক থেকে পুরোপুরি সুস্থ মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

মানসিক রোগকে বিভিন্ন উপায়ে ভাগ করা যায়। মনোবিকার নামক মানসিক রোগে চিন্তাশক্তি, অনুভূতি ও আচরণের সুস্পষ্ট অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। এ ধরনের অসুস্থতা একজন ব্যক্তিকে সমাজে কাজ করার অনুপযোগী করে তোলে। মনোবিকারগ্রস্ত রোগীর ক্ষেত্রে অন্তর্দৃষ্টি কাজ করে না এবং বাস্তব সমস্যা উপলব্ধি করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। সিজোফ্রেনিয়া ও চিত্তবৈকল্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়ামূলক মনোবিকার। সিজোফ্রেনিয়া শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ মন ভেঙে যাওয়া। অর্থাত্, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানসিক কাজকর্মের বিশৃঙ্খলতা বা যোগাযোগহীনতা। ভ্রান্তি, মতিভ্রম, অসংলগ্ন কথাবার্তা, অসংলগ্ন আচরণ, নেতিবাচক ধারণা ইত্যাদি সিজোফ্রেনিয়াগ্রস্ত রোগীদের মধ্যে দেখা যায়। বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সব রোগীর মধ্যে প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত। নিউরোসিস বা স্নায়ুবিকার আবেগজনিত জটিলতা, যা প্রাথমিকভাবে দুশ্চিন্তার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। স্নায়ুবিকার মনোবিকারের তুলনায় কম মারাত্মক। স্নায়ুবিকারগ্রস্ত ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক ও কর্মদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবাস্তব ও অসংগত ভীতি বা দুশ্চিন্তা এ ধরনের জটিলতার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।

ব্যক্তিত্বজনিত জটিলতা হলো দীর্ঘস্থায়ী অনমনীয়, অসংলগ্ন অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও আচরণ, যা সামাজিক অথবা পেশাগত কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ব্যক্তিত্বজনিত জটিলতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষদের মধ্যে দেখা যায় এবং এই জটিলতা যুবক ও অল্প বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

মানসিক প্রতিবন্ধিত্ব মস্তিষ্কের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশের ফলে সৃষ্ট অবনমিত বুদ্ধিমত্তা। এতে শৈশবকাল থেকেই বুদ্ধিমত্তার অভাব, বেড়ে ওঠার সময়কালে স্বল্প ও মন্থর মানসিক বিকাশ, খর্বিত শিক্ষণক্ষমতা এবং দুর্বল আচরণগত ও সামাজিক অভিযোজ্যতা দেখা দিতে থাকে। এটি একটি স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা কিন্তু কোনো রোগ নয়।

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অনুন্নত। এ দেশে সরকারিভাবে মানসিক অসুস্থ লোকের যত্ন ও চিকিত্সাব্যবস্থা ১৯৫৭ সালে পাবনায় ৬০ শয্যাবিশিষ্ট একটি মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়। শয্যাসংখ্যা পরে বৃদ্ধি করে ৪০০-তে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ঢাকায় উপজেলা চিকিত্সা কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক চিকিত্সার ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিছু বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট মানসিক রোগীদের চিকিত্সাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মনোরোগ বিশারদ রয়েছেন স্বল্পসংখ্যক। ঢাকা ও অন্যান্য কিছু শহরে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিত্সার সুবিধা পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বিশাল জনগোষ্ঠী এ ধরনের সেবা ও সুবিধা খুব অল্প মাত্রায় ভোগ করে থাকে। এখনো মানসিক রোগের ক্ষেত্রে পূর্বসংস্কার, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকদের মধ্যে দেখা যায়। মানসিক অসুস্থতা অতিপ্রাকৃত শক্তির দ্বারা অথবা ভৌতিক শক্তির দ্বারা ঘটে এবং এগুলোর অধিকাংশই অনিরাময়যোগ্য—এটি একটি প্রচলিত বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে মানসিকভাবে অসুস্থ অনেক রোগীই ধর্মীয় ও সনাতন পদ্ধতিতে চিকিত্সা গ্রহণ করে। এছাড়া ফকির, কবিরাজ এবং জাদুকরের কাছেও চিকিত্সার জন্য গিয়ে থাকে। এদের অধিকাংশই রোগীদের অসংলগ্ন চিকিত্সা প্রদান করে এবং শোষণ করে। বাংলাদেশে মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা এখন পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য কোনো উন্নত কেন্দ্র নেই। মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দেশে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-সুবিধার প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

n লেখক : সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়