এসো ‘মা’ পরমা প্রকৃতি, পরমেশ্বরী, নগনন্দিনী
হৈমবতী! এসো! ধবল তুষার সিঁড়ি ভেঙ্গে, শরত শিশির
সিক্ত কাশবন মাড়িয়ে, এসো ‘মা’ আদ্যাশক্তি,
ভবেশ-ভাবিনী, স্বর-হর-প্রিয়া, ঈশাণী! এসো নেমে
মর্ত্যাধামে, কৈলাশ ছেড়ে, ভক্তি সুধারসে সিক্ত,
তব ভক্তবৃন্দ গাহিছে ‘আগমনী’ অমৃত ভাষে,
হে নিস্তারিনী! তব এ লীলাস্থলে, যুগে যুগে কতরূপে
এলে তুমি, হে মহামায়া, চির লীলাময়ী! তব ‘আগমনী’
রাগ লহর মন্দ্রে বিমোহিত ত্রিভূবন, আনন্দ শিহরণে
নটতি প্রকৃতি। বিপত্তারিনী ‘মা’ তুমি জগদ্ধাত্রী!
কখন কোন স্বরূপে স্বয়ম্ভূ হও তুমি? কে বুঝিবে?
তব মহামায়া মহাস্বরূপ, চিন্ময় মহা সাধু বিনে?
ছিলে যখন সতী নামে তব পতিশিবেরপুরে,
চিনে ছিল কি বিরূপাক্ষ তব? যদবধি না
প্রকাশিলে নিজেরে দশমহাবিদ্যার মূর্তিরূপে।
বল মা! আমি নির্বোধ, মূঢ়, বুঝিব কেমনে তব স্বরূপ?
জ্ঞানময় দিব্যদৃষ্টি বিনে; যজ্ঞে পতি নিন্দাশুনে, তব পিত:
মুখে, ক্লেশে পতিব্রতা সতী তুমি ত্যাগিয়া দেহ,
পার্বতী রূপে পূনঃজন্ম নিলে মেনকার গর্ভে;
কঠোর তপস্যা বলে ফের ভর্তারূপে শিবকে পেলে।
কত যে বিভূতি তব ‘মা’; তুমি বিশালাক্ষী, হেমাঙ্গিনী
অনাদ্যন্ত গূঢ় মায়াময়ী, কত যে রূপে, স্বরূপে উরহ
এ মর্ত্যাধামে, তুমি ‘মা’ দুর্গতিনশিনী, প্রশান্তিময়ী!
‘মা’ তুমিই দুর্গা, চন্ডি, অম্বিকা, অন্নদা, কাত্যায়নি,
শশাঙ্কধারিনী, অভয়া, উমা, গৌরী, গিরিজা, প্রসন্নময়ী,
শৈলবালা, শৈলসুতা, নিস্তারিনী, হরপ্রিয়া, শুভঙ্করী, ভক্তের
হৃদে আরো কত যে নামে আজন্তকাল জীয়ন্ত তুমি।
ঔদ্ধত্য অহঙ্কারী অসুররূপী রিপু বিনাশে আবার উরহ ‘মা’
ভূভারতে, কোটি তপনের তেজসম জ্যোতিময়ী রূপে,
যেমতি আবির্ভূতা হয়েছিলে দেবকুল উদ্ধত্য অহমিকা নাশে,
ভগবতী জগদাত্রী স্বরূপে।
সর্ব মঙ্গল্যা তুমি, দয়া, কৃপাময়ী কল্লানী, ক্ষেমঙ্করী
সর্বভূতে, সর্বালংঙ্কার ভূষিতা ‘মা’ তুমি বসন্ত বসনে
আস মর্ত্যে বাসন্তীরূপে, রঘুপতি স্মরণে অকাল বোধন হলো
‘মা’ তব শরৎ-এ, কৃপাময়ীতুমি, তব কৃপা লভিতে
পূজিল রাম তোমা: রাঘবারি রাবন বধিতে।
সে যে অববুদ্ধ হলে ‘মা’ আর না নিন্দ্রা কাতর হলে,
চিরাচরিত শরৎ-এ হে মাত: হৈমবতী! হৈমবতবাসী
মাতি পরমানন্দে শারদীয় দুর্গা উৎসবে, অর্চনা করিছে
তব মহা আড়ম্বরে।
হে মাতা মহামায়া! হৈমবত নন্দিনী, জগদ্ধাত্রী নিস্তারিনী,
চেয়ে দেখ কত অসুরিক শক্তির ভয়ঙ্কর ত্রাসানলে জ্বলিছে
দ্যাবা পৃথিবী, তুমি এসো ‘মা’ জাত, ধর্ম, বর্ণ ভেদ ছেদ
করে, সর্বজনীন রূপে অশুভ শক্তি বিনাশী সহস্র প্রহরণ সাজে,
দশমহাবিদ্যার শক্তিময়ী মূর্তিরূপে।
বাহুবলে জিনিয়া স্বর্গরাজ্য দ্বৈত্যরাজ মহিষাসুর, বিতাড়িত
করিলো দেবগণে, ক্রোধানলে বেপমান দেবকুল তনু নিঃসৃত
ঘনিভূত তেজতরঙ্গ রাশি হতে, উর হলে ‘মা’ মহা তেজস্বনী
দেবসাদৃশ্য দৈবাস্ত্রধারিনী দেবারি বিনাশী দেবী দুর্গারূপে।
ওঙ্কার, (প্রণব) রাগ মন্দ্রে জাগিল ত্রিভূবন, জয় জয় নাদ
করিল সবে, কৃপাময়ী তুমি, কৃপা করিতে চাহিলে অবাধ্য
বৎসেরে অমিয়বাণীতে, নির্বোধ ঔদ্ধত্য অহং অহঙ্কারে
অবজ্ঞা করিলো তব রুঠো অট্টহাসিতে তুচ্ছজ্ঞানে, দম্ভবশে
দম্ভোক্তিতে কহিল দুরাচার, ‘হে অবলা নারী! বৃথাই কালক্ষয়
করিছ তুমি নিরর্থবাক্য ব্যয়ে, নহি তুষ্ঠ, পরিপুষ্ট বিগলিত
আমি তব মাতৃবৎ বচনে।
এসো সম্মূখ রণে, দেখ হে নারী! মহিষাসুর কত শক্তি ধরে?
কহিলে দেবী স্মিত হেসে, ‘যথার্থ বৎসে, ভৈরবী প্রকাশিলা
নিজেরে, ভীষণাদর্শন মহা ভয়ঙ্করী, দৈতত্রাসন, সহস্র
পাণীতে উদ্যত সহস্র প্রহরণ, নিষন্ন হর্যক্ষ বাহনে।
দেখে মায়ের সংহারিনী মায়াময়ী অসুর বিনাশী রূপ,
বিবশ মহিষাসুর অস্ত্রাঘাতে পড়ি লুটাইয়া মায়ের পদতলে,
কহিলো কাতরে যুক্তকরে, ‘মাগো! নির্বোধ আমি আত্ম
ঔদ্ধত্য অহঙ্কার বশে চিনিতে পারিনি তোমারে,
ক্ষমা কর ‘মা’ তব এ অধম অবাধ্য বৎসেরে, মোগো!
অনন্তকাল থেকে তব পদপাদ্ম তলে লভিতে পারি যেন
অর্চনার অর্ঘ্য ভাগ’।
দয়ার্দ্রচিত্ত স্নেহময়ী মা অশ্রু আঁখিরে হেরে, কহিলা
কৃপাময়ী অমৃত ভাষে, ‘তথাস্ত বৎসে, আজি হতে রয়ে
মম পদতলে, তুমিও লভিবে পুজার অর্ঘ্য ভাগ এ ধরাধামে’।
জয় জয় রবে আনন্দ উল্লাসে মাতি দেবগণ করিল
দেবীর স্তব, স্তুতি,
‘সর্বমঙ্গল-মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে,
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়নি নমোহস্ততে।’
আর ভক্তি সুধারসে সিক্ত ভক্তবৃন্দ তব চরণ বন্দনায়
অহনির্শি করে আরতি, নমঃ কোটি... নম তব পদাম্বুজে,
হে দয়াময়ী, কল্যাণী, কামনাদায়িনী, সর্বভূতে আশ্রয়
স্বরূপিনী পরমা প্রকৃতি পরমেশ্বরী, সর্বানুভূত, সর্বগত,
হে ‘মা’! মহাদেবী দুর্গা, দুর্গা... ।
আত্মতত্ব গীত ও কাব্য গ্রন্থের অংশবিশেষ...
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
