নির্বাচন কমিশন ও সুষ্ঠু নির্বাচন

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ২১:৪৪

গল্পটি উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর। শিয়াল বড্ড চালাক দেখিয়া কুমির ভাবিল, তাহার সাতটি ছেলেকে শিয়ালের নিকট লেখাপড়া শিখাইতে পাঠানো যাক। পড়ানোর নামে শিয়াল প্রতিদিন কুমিরের একটি করিয়া বাচ্চা খাইয়া ফেলিত। আর কুমির বাচ্চা দেখিতে চাহিলে একই বাচ্চাকে শিয়াল ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দেখাইত। এমনি করিয়া শিয়াল যখন কুমিরের সাতটি বাচ্চাই খাইয়া ফেলিল, তখন সেইখান হইতে শিয়াল পালাইয়া গেল। পলায়নরত শিয়ালকে পাকড়াও করিয়া তাহার পা কামড়াইয়া ধরিল কুমির। শিয়াল বলিল, আমার লাঠিগাছা ধরিয়া কে টানাটানি করিতেছে রে? কুমির ভাবিল, তাই তো! পা ধরিতে গিয়া লাঠি ধরিতেছি কেন? শিগিগর লাঠি ছাড়িয়া পা ধরি! কুমির শিয়ালের পা ছাড়িয়া দিলে অমনি শিয়াল একলাফে পালাইয়া বনের ভিতরে ঢুকিয়া যায়।

এই গল্পের পর আমরা এখন সুষ্ঠু নির্বাচন লইয়া কিছু পর্যবেক্ষণ শেয়ার করিতে পারি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু সেই নির্বাচন যখন আর নির্বাচন থাকে না, তখন মানুষ ইহার সমাধানের জন্য অনেক ধরনের পরামর্শ দিয়া থাকেন। যাহারা কোনো দিন ইউনিয়ন পর্যায়েও নির্বাচন করেন নাই, তাহারা কত ধরনের থিউরি ও বিজ্ঞ মতামত ব্যক্ত করেন। সুতরাং তাহাদের মতামতও হয় অন্ধ উইপোকাদের মতো। নিঃসন্দেহে তাহা হাস্যকর এবং বাস্তববিবর্জিত। লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী ইকোনমিস্টের গবেষণা শাখা ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ বলিতেছে, এশিয়ায় এমন অনেক দেশ রহিয়াছে যেইগুলি না-গণতান্ত্রিক, না-কর্তৃত্ববাদী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে আখ্যায়িত করেন—‘হাইব্রিড রেজিম’ বা দো-আঁশলা শাসনব্যবস্থা হিসাবে। তৃতীয় বিশ্বের কথিত গণতান্ত্রিক অনেক দেশে ইহার নূতন নূতন রূপ দেখা যায়। এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেহেতু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের বিষয়টিও অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করেন। কিন্তু একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই কি যথেষ্ট? তৃতীয় বিশ্বের কিছু কিছু দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পূর্ণত নির্ভর করিয়া থাকে প্রশাসনের ওপর। এইখানে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক একটি নির্বাচনি এলাকায় অর্ধশতাধিক ভোটকেন্দ্র রহিয়াছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ভোটার সংখ্যার অনুপাতে একাধিক বুথ থাকে। বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত, আগস্ট ১৯, ২০০২-এ বলা হইয়াছে, রিটার্নিং অফিসার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য ভোট গ্রহণের উদ্দেশ্যে একজন প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রিজাইডিং অফিসারকে সহায়তা করিবার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ করিবেন। একটি কেন্দ্রে একজন প্রিজাইডিং অফিসার থাকেন, যিনি কোনো স্কুলের হেডমাস্টার কিংবা মাদ্রাসার সুপার পদমর্যাদার কেহ হইয়া থাকেন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হন মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদমর্যাদার। প্রতিটি বুথে সাধারণত দুই জন পোলিং এজেন্ট থাকেন। ইহার পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের প্রতিনিধিও থাকেন। তাহা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নানান স্তরের বাহিনী মোতায়েন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সামরিক বাহিনীও কোথাও কোথাও মোতায়েন করা হয়। সুতরাং মেকানিজমটা হয় ইহার ভিতর দিয়াই। বিশ্বের স্বনামধন্য কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলিতেছে, নির্বাচন কারচুপির মেকানিজমটা তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে।

মনে রাখিতে হইবে, নির্বাচন কমিশন বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দিবেন। এবং রাষ্ট্রপতির এই এক্তিয়ার সংবিধান অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষ। এইখানে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিবেন। গবেষণা প্রতিবেদন বলিতেছে, শাসক দলের কর্মীরা প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন কমিশনের সহিত যোগসাজশের মাধ্যমে নির্বাচনকে নিজের মতো সাজাইতে পারেন। বলা হইয়া থাকে, আর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন এজেন্সি যখন সরকারের অধীনেই কাজ করে তখন নির্বাচন কমিশন অনেকটাই ঠুঁটো জগন্নাথ হইয়া পড়েন। বাতাসে ফিসফিসানি আছে, ইউনিয়ন পর্যায়েও একজন প্রার্থী নির্বাচন করিতে এখন কোটি টাকাও খরচ করিতে বাধ্য হন। এমনকি যাহারা জয়-পরাজয় নির্ধারণ করিয়া থাকেন, তাহারা কোনো আদর্শ বা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে ইহা করেন না। ইহা করেন শুধু পয়সার বিনিময়ে।

সুতরাং পাওয়ারফুল সার্চ কমিটির মাধ্যমে যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে বসাইয়া নির্বাচন কমিশন গঠন করা হউক কেন—তাহাতে কাজ হইবে না। সমস্যার শিকড় অন্য জায়গায় গাড়িয়া বসিয়াছে। আমরা কুমিরের মতো বুঝিতেছি না—কোনটা লাঠি আর কোনটা শিয়ালের পা।