তাদের বিদায়বেলায় কেন এই অবহেলা-অনাদর?

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ২১:৪৬

সমাজে সবচেয়ে অবহেলার শিকার এখন অসহায় প্রবীণরাই। প্রবীণরা অসুস্থ, অসহায়, অবহেলিত, নিঃসঙ্গ ও সেবাহীন জীবন যাপন করছেন। বার্ধক্যের অসহায়ত্ব মোকাবিলায় সবাইকে ভাবতে হবে। কারণ, আজ যে টগবগে যুবক কাল তিনি হয়ে যাবেন এক অসহায় প্রবীণ। বার্ধক্য সবাইকে ছুঁয়ে যাবেই।

প্রবীণ মানুষদের বিদেশে বলে সিনিয়র সিটিজেন। আমি যখন ৬০ বছরে পা রাখলাম তার আগেই লোকাল এমপির পাঠানো শুভেচ্ছা কার্ড পৌঁছে গিয়েছিল বাড়িতে। কদিন পর সরকারি নানা দপ্তর থেকে চিঠি আসা শুরু করেছিল। বিশেষত স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে একের পর এক টেস্ট তাও অধিকাংশ ফ্রি।

একদিকে এতে যেমন সুরক্ষা বা কুশলে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বয়স যে বেড়েছে তা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বয়সের বিচারে ষাট বছরে পা রাখা মানে প্রবীণ। কিন্তু মনের বিচারে? মনের ভালোমন্দ কি নবীন-প্রবীণ মানে? না মন মানতে চায় তা? বরং ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, শরীর মনে করিয়ে দিলেও মন তা মানে না। মনে হয় আগের মতো সব কাজ তেমন ভাবে করা যাবে। কিন্তু কাজ করতে গেলেই বোঝা যায় শরীর আগের জায়গায় নাই। শ্লথ হয়ে আসা শরীর পারে না অনেক কিছুই।

এসব কারণে প্রবীণ মানুষদের দরকার সাহচর্য। তাদের প্রয়োজন সহমর্মিতার হাত। অথচ দেশে ও সমাজে এরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। দিল্লিতে বড়সড় একটা বুকশপে গিয়েছিলাম বই কিনতে। চমত্কার সাজানো বইয়ের দোকানটির এক কোণে দেখি কফি, স্ন্যাকস আর টেবিলে টেবিলে কিছু বই। ভাবলাম এরা কি তবে সব ক্রেতাকেই চা-কফি খাইয়ে বিদায় করে? এবং তা কি সম্ভব? ভালো করে তাকাতেই দেখি পরিষ্কার লেখা আছে, কেবল সিনিয়র সিটিজেনই পারবেন ওসব টেবিলে বসে বই পড়তে, সঙ্গে চা-কফি ফ্রি। কী দারুণ ব্যবস্থা।

ঠিক তার উলটো চিত্র দেখেছিলাম বাঙালি দোকানে। কানে কম শুনতে পাওয়া এক বয়সি নারীকে ধমকাচ্ছিলেন দোকানের সেলসম্যান। আশপাশের লোকজনদের কেউ কেউ মজা নিচ্ছিলেন আর কেউ কেউ বিরক্তির চরম সীমায়। যেন কানে কম শোনাটা বিরাট এক অপরাধ। যে কোনো উন্নত দেশে প্রবীণদের জন্য বাসে ট্রেনে গাড়িতে আলাদা সিট থাকে। এবং কোনোভাবেই কেউ তা ব্যবহার করে না। খালি থাকলেও নয়। আমাদের সমাজে তার উলটো। যদি থাকেও প্রবীণ কেউ আসলে তাকে সিট ছেড়ে দেওয়ার জন্য অন্যদের হাত লাগানো বা মারামারির বিকল্প নেই।

সবচেয়ে বেশি অবহেলা আর নির্যাতন করা হয় ঘরে। নির্যাতন শব্দটি ভালো করে বুঝতে হবে। এটি কেবল শারীরিক নয়। যখন একজন মানুষ কানে কম শুনতে শুরু করে তখন তিনি হয়তো তা বুঝতে পারেন না। বোঝার সময় আসতে আসতেই তার প্রতি যে অনাচার-অবিচার সেটা কি কেউ খেয়াল করেন? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখছি ঘরের মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তাদের। হয়তো তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না তারা কেন কী করছে। কিন্তু যে মানুষটি ভুক্তভোগী তার জীবনে তখন নেমে আসে করুণ ছায়া। তিনি মনে মনে একা হতে হতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যান, যাকে পরিভাষায় বলা হয় উইথড্রয়াল সিম্পটম। এর মানে হচ্ছে এই মানুষটি আর কাউকে সহ্য করতে পারেন না। তার মনে হতে থাকে, এ দুনিয়ায় তিনি অচল। আর এই অসহায়ত্ব তাকে আরো জেদি আর অভিমানী করে তোলে। সে জেদ আর অভিমান থেকেই একা জীবন একা একটি ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতে থাকতে হয়ে ওঠেন মনোরোগী। এমন বয়স্ক মনোরোগী দেশে ঘরে ঘরে আছে। তাদের কেউ কোনো দিন বলে না, চলো আজ বিকেলে আমার সঙ্গে পার্কে চলো। বা বলে না, চলুন আপনাকে কোনো হোটেলে নিয়ে যাই। নিয়ে যাই কোনো থিয়েটারে। বরং উলটোটাই দেখি আমরা। তরুণ-তরুণীরা কমবয়সিরা সিনেমা থিয়েটার দেখতে যাবার আগে লিস্ট করার সময় এদের নাম কেটে বাদ দিয়ে দেয়। বলে, উনি বুড়া মানুষ, উনি গিয়ে কী করবে? এই যে অবহেলা আর সরিয়ে রাখা, এর কষ্ট বোঝা সহজ নয়।

আমি আমার জীবন থেকে বলতে পারি, আমার মা সবার প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। ছেলে-বুড়ো সবাইকে তিনি ভালোবাসতেন, ভালোবাসাও পেতেন তেমন। অথচ সে তারাই শেষের দিকে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত না। ততদিনে মা কানে খাটো, কম শোনেন। অনেক কথা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। ছিল আলঝেইমার। স্মৃতিশক্তির সে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সময় দিত না কেউ। অসংলগ্ন কিংবা ভুল কিছু বললে মুখ টিপে হাসত সবাই। মা ঠিকই বুঝতেন। আমি বেড়াতে গেলে যখনই এমন প্রসঙ্গ তুলতাম এক গাল হাসি হেসে এড়িয়ে যেতে চাইতেন। মাঝে মাঝে বলে ফেলতেন, ওরা কেউই তাকে সময় দিতে চায় না। গুরুত্ব দেয় না। ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। আমার ছোট দিদির মতো অনেকে আছেন, যারা এদের ভালোবেসে সময় দিত বা দেয়। এরাই ভরসা। এরাই এদের মনটাকে বাঁচিয়ে রাখে।

দিনকাল পালটেছে। এখন প্রবীণদের জন্য ওল্ড হোম বৃদ্ধাশ্রম আছে। বিদেশে এসব ওল্ড হোমও এখন শ্রেণিবিভাগের আওতায়। যেমন ভারতীয়রা এই ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। সেখানে থাকলে জিটিভি, হিন্দি সিনেমা, সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা সব দেখা যাবে। খাবারও তেমন ভারতীয় স্টাইলের। আবার শ্বেতাঙ্গদেরও আছে এমন শত শত ওল্ডহোম। বাংলাদেশের প্রবীণদের জন্য এখনো তেমন একক কিছু না হলেও এ দেশে এই সিডনি শহরে যে তা হবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

এখন ডিজিটাল দুনিয়া। পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। সে দুনিয়ায় প্রবীণরাও পিছিয়ে নাই। এই যেমন আমি ষাট পেরোনো মানুষ আমি কম্পিউটারে টাইপ করছি ফেসবুকিং করি। সামাজিক মিডিয়ার কল্যাণে জগতের সঙ্গে থাকি। আমার চাইতেও বয়স্ক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও আছেন এই দলে। কাজেই তাদের হাতে রসদ থাকলে বা উপকরণ থাকলে তারাও আজ একা নন। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার বা তারুণ্যের মতো ব্যবহার তারা পারেন না। তাই তাদের সাহায্য আর সহায়তা দরকার।

সবার ওপরে রাষ্ট্র সমাজ আর মানুষের সহমর্মিতা। এগুলো যতদিন গড়ে না উঠবে কিংবা যতদিন প্রবীণদের পাশে না দাঁড়াবে ততদিন কিছু হবে না। একটা কথা আমরা সব সময় বলি একদিন সবাই বুড়োবুড়ি হবে কাজেই মানতে শেখো। তারচেয়েও জরুরি একটা কথা কেন বলি না? এই মানুষগুলোর আয়ু আর কতদিন? সারা জীবন যারা শ্রম মেধা বুদ্ধি বিদ্যা দিয়ে সংসার পালন করেছে, দেশ ও মানুষের পাশে ছিল, বিদায়বেলার কিছু বছর কি তাদের আমরা ভালোভাবে সহ্য করে বিদায় জানাব না?

n লেখক :সিডনিপ্রবাসী