দেশের দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলেই হবে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুেক দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি আখ্যায়িত করে বলেছেন, তার সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে যদি আরেকটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট আমরা করতে পারি তাহলে বিদ্যুতের জন্য আমাদের আর অসুবিধা হবে না। এ সময় ‘আর যেন কোনো শকুনির থাবা না পড়ে বাংলাদেশের ওপর’ এবং ‘বাংলাদেশের এই উন্নতি এবং অগ্রগতি যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়’ সেজন্যও সবাইকে সতর্ক করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের            মূল যন্ত্র রি-অ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল (আরএনপিপি-পারমাণবিক চুল্লিপাত্র) স্থাপনের কাজের উদ্বোধনকালে এ কথাগুলো বলেন। গতকাল রবিবার দুপুর পৌনে ১২টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণে রাশিয়ার সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ও আমরা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আর এই পাওয়ার প্ল্যান্টটি হয়ে যাওয়ার পর আমরা দক্ষিণাঞ্চলে জায়গা খুঁজছি। যদিও দক্ষিণাঞ্চলে শক্ত মাটিওয়ালা জায়গা পাওয়া খুবই কঠিন। শেখ হাসিনা বলেন, বিভিন্ন দিক এবং বিভিন্ন জায়গা আমরা সার্ভে করছি, আরেকটি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমরা করব। তিনি বলেন, আমরা বহুমুখী বিদ্যুত্ উত্পাদন করে যাচ্ছি এই জন্য যে, এই বিদ্যুত্ সুবিধা যাতে মানুষ পায় এবং এটা যাতে অব্যাহত থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রূপপুরে পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বসানোর এ ঘটনা পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর ফলে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে যাবে। ঐ কেন্দ্রের যে যন্ত্রে নিউক্লিয়ার ফুয়েল (পারমাণবিক জ্বালানি) ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয় তার মূল কাঠামো হচ্ছে এই বিশেষ যন্ত্র (পারমাণবিক চুল্লিপাত্র)। এটিকে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের হূিপণ্ড বলা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব জিয়াউল হাসান স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মো. শওকত আকবর বিদ্যুেকন্দ্রের মূল যন্ত্র রি-অ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের সময় আরএনপিপি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন। অনুষ্ঠানে নির্মাণাধীন বিদ্যুেকন্দ্রের ওপর একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। পারমাণবিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি অ্যাসোসিয়েশন (আইএইএ)-র গাইডলাইন অনুযায়ী এবং সংস্থাটির কড়া নজরদারির মধ্য দিয়েই রূপপুর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র প্রকল্প (আরএনপিপি) বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। সূত্র মতে, ইউনিট-১-এর ভৌত কাঠামোর ভেতরে রি-অ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ স্থাপন সম্পন্ন হবে। এর ফলে এই ইউনিটের রি-অ্যাক্টর ভবনের ভেতরের কাজ প্রায় শেষ হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকেও ১২০০ মেগাওয়াট অর্থাত্ মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে আমরা বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। ২০২৩ সালে আমাদের প্রথম ইউনিট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি আরো ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই সময়ে যে আমরা এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম, বিশেষ করে রি-অ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল আমরা স্থাপন করলাম—এটা সত্যিই আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। তিনি বলেন, আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না ২০৪১ এ উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা গড়ব। দেশ ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপন করবে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময়ে আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবেই সেটা উদ্যাপন করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের অনেক পূর্বেই জাতির পিতা এখানে বিদ্যুতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছিলেন এবং পাকিস্তান সরকারের নিকট তার দাবির পরিপেক্ষিতেই ১৯৬১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালেই বঙ্গবন্ধু ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ ‘আইএইএর সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন। সে সময় দেশের পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিচালক হিসেবে তার প্রয়াত স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ারও বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে এই পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র বাংলাদেশ আরো আগেই নির্মাণ করতে পারতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে ২১ বছর পর সরকারে এসেই আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালের মধ্যে ‘সবার জন্য বিদ্যুত্’ সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে ‘ভিশন স্টেটমেন্ট ও পলিসি স্টেটমেন্ট অন পাওয়ার সেক্টর রিফর্মস’ প্রণয়ন ও অনুমোদন করে। পাশাপাশি জাতির পিতার স্বপ্নের ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসেই অন্যান্য জনবান্ধব প্রকল্পগুলোর মতো তার সরকারের এই প্রকল্পের কাজও বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বিদ্যুেক উন্মুক্ত করে দেওয়াসহ ছোট ছোট বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দানের ফলে সে সময়ে দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট হয়। অথচ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর দেখা যায় সেই বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে গেছে। অর্থাত্ এক ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদনও বিএনপির আমলে বৃদ্ধি করা হয় নাই বরং এ খাতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর তার সরকার আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত রূপকল্প-২০২১-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান-২০১০’ প্রণয়ন করে এবং আবার রূপপুর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

তার সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে প্রায় তিন থেকে চার স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমরা করেছি। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা প্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের শুরুতেই রাশিয়ার সঙ্গে তার সরকারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চুক্তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে পরিবেশ দূষণ আর হয় না। কারণ সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটারও খুব একটা সুযোগ থাকে না।