শরতের দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের জীবনের এক প্রধান উত্সব। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনা মহামারিতে পৃথিবী স্তিমিত হলেও প্রকৃতিতে শরতের গুঞ্জন থেমে নেই। থেকে থেকে বিষাদের সঙ্গেই মনে বাজে নতুন করে বাঁচার সাধ। আপনজন হারানোর ব্যথা, জীবন ও জীবিকার ওপর বিস্তৃত করোনার থাবা, অর্থনীতির মন্থর গতি—এরই মধ্যে দুর্গতিনাশিনী মা আসছেন।
শাস্ত্রমতে এবার দুর্গাদেবীর ঘোটকে আগমন, ফল—ছত্রভঙ্গ এবং দোলায় গমন, ফল—মড়ক। করোনাসৃষ্ট ভয়াবহ মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেই প্রকৃতি সাজছে মাকে বরণ করার জন্য। বিশ্বের সব মানুষের মনে একই আশা, যেন বছরটা ভালো কাটে। অন্ধকারের পরে সূর্যোদয়, দুর্যোগের পরে আলোর বন্যা। এ তো প্রাকৃতিক নিয়ম। তার ব্যত্যয় হতে পারে না। নইলে সৃষ্টি থাকে না। দুর্গতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই দুর্গতিনাশিনীর মর্ত্যে আগমন। মায়ের আশীর্বাদে করোনাসৃষ্ট বিপর্যয় অবশ্যই পরাজিত হবে, কেটে যাবে দুঃসময়।
যা বলছিলাম, এই মহামারির মধ্যেই এবারও মাতৃ আরাধনা। স্বাভাবিকভাবে পূজায় মহামারির প্রভাব পড়েছে গত বছরের মতোই। পাঁচ দিনের পূজা। মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনা দিয়ে শুরু। বিরাজিত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তানরা মায়ের পূজার্চনা করবেন, অঞ্জলি দেবেন, প্রার্থনা জানাবেন শান্তি-সমৃদ্ধির, মহামারি থেকে মানবজাতির মুক্তির, অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের জন্যই এই প্রার্থনা। বিপর্যয়ের পর নতুন জীবনের প্রার্থনা। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ বিশ্বশান্তি এবং করোনা থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার কর্মসূচি রেখেছে এবারও। এটা আমাদের ঐতিহ্য, যা জন্মাষ্টমীর গীতাযজ্ঞে মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রার্থনা থেকে উত্সারিত হয়েছে।
এ বছরও পূজা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে, স্বাভাবিকভাবে ভক্তসমাগম কম হতে পারে। পাঁচ দিনব্যাপী পূজায় রয়েছে নানা আচার, আনুষ্ঠানিকতা এবং প্রতিটি অনুষ্ঠানই গভীর অর্থবহ। এই উত্সবের দুটি দিকের একটি হচ্ছে সামাজিক এবং অন্যটি ধর্মীয়। ধর্মীয় পর্যায়ে ভক্তরা মায়ের পূজায় অংশ নেবে, মায়ের আরতি হবে, অঞ্জলি দেবে, হূদয়ের আকুতি ব্যক্ত করবে মায়ের কাছে, প্রসাদ নেবে, পরিবারের সবাই শরিক হবে। দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণও এই পর্যায়েরই অংশ। ধর্মও সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই উত্সবের অন্যতম এবং বিশেষ দিকটি হচ্ছে সামাজিক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে এই উত্সব হয় সর্বজনীন। বলতে দ্বিধা নেই, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই সামাজিক মেলবন্ধন, সহজ কথায় পূজার সামাজিক দিকটি।
শারদীয় দুর্গাপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিটি বাঙালি পরিবারে এই উত্সবকে কেন্দ্র করেই সবার সম্মিলন ঘটে। মা আসছেন, তাই পরিবারের সব সদস্য একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেন। আগে দেখা যেত শারদীয় দুর্গাপূজায় বাঙালি ঘরে ফিরত, সারা বছরের মধ্যে বিদেশে কর্মরতদের এটা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার একটা বড় উপলক্ষ্য। তত্কালীন সামাজিক অবস্থার বিবরণ থেকে জানা যায়, তখন পারিবারিক পূজা ছিল বেশি। সর্বজনীন বা বারোয়ারি পূজা ছিল কম। তবুও পূজায় বাড়ি ফিরতেন সবাই। লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত অবস্থান করতেন, এর পরই কর্মস্থলে ফেরার পালা। তাই পূজাই ছিল কার্যত পারিবারিক উত্সব। দেশের সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছরে পূজা বেড়েছে। বলা যায় বাড়ির কাছেই পূজা। বেড়েছে সম্পৃক্ততা।
বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তার কারণে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী হয়ে পড়ে, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হয়ে পড়ে ব্যাহত। কিন্তু বাংলাদেশ কিছুটা ব্যতিক্রম এই ক্ষেত্রে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমাদের এই বাংলাদেশ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকারের লড়াই, গণ-অভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ সব ক্ষেত্রে এক স্রোতধারায় মিলিত হয়েছে সব ধর্ম, রক্ত মিশেছে সবার রক্তের সঙ্গে। সর্বজনীনতার ধারাটি এভাবেই তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী গুটিকয়েক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কারণে মাঝে মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনা কোনোভাবেই ব্যাহত করতে পারবে না এই সম্প্রীতিকে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ কিংবা ‘ধর্ম যার যার, উত্সব সবার’—এই চেতনার মূল সুর ঢাকেশ্বরী অঙ্গন থেকেই উত্সারিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বজনীন এই চেতনার কথা প্রায়ই উল্লেখ করেন। তাই ‘মানবজাতির দুর্গতি’ করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও আমরা সর্বজনীন চেতনায় দেখতে চাই।
আমরা প্রার্থনা করি, করোনার কালো দুর্যোগপূর্ণ এই মহামারি সাময়িক করোনাকাল কেটে যাবে, আবার উত্সব ফিরবে উত্সবের আঙ্গিকে। আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে পূজার সৌন্দর্য ব্যাহত হওয়ার মতো, কিংবা ধর্মীয় চেতনা ক্ষুণ্ন হতে পারে, এমন কিছু যেন না হয়। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ বৃদ্ধি উত্সবের ঘাটতি পূরণ করবে এ বছরও। অবশ্যই এই দুর্দিন কেটে যাবে, পৃথিবী আবার প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেবে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মায়ের কাছে এই প্রার্থনাই রইল—‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/ তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে/ তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা/ বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।’
n লেখক :সাংবাদিক ও সাবেক প্রেস মিনিস্টার
