পটুয়াখালীর লেবুখালী নদীতে পায়রা সেতুর কাজ সমাপ্তির মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত রূপের দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলবাসী। অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত পায়রা সেতু খুলে দেওয়া হচ্ছে চলতি অক্টোবর মাসে। এখন চলছে সৌন্দর্যবর্ধনসহ আনুষঙ্গিক কাজ। সাগরকন্যা কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা মাথায় রেখে সেতুটি নান্দনিক রূপে গড়ে তোলা হয়েছে। দেশের সর্ব দক্ষিণের সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত এবং বাংলাদেশের তৃতীয় পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত ফেরিবিহীন সড়ক যোগাযোগ চালু এখন সময়ের ব্যাপার। পায়রা নদীর ওপর নির্মিত ১ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়ন এবং এটি খুলে দিবে যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
বর্তমান সরকার সারা দেশের সঙ্গে অবহেলিত জনপদ দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালীর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আরো সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ১ হাজার ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্থের পায়রা নদীর ওপর লেবুখালীতে সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নাগরিকসুবিধা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে সেতু নির্মাণের জন্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপর সরকার গঠনের পরপরই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১১ সালে কুয়েত সরকারের সঙ্গে সেতু নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ শেখ হাসিনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়েই মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণকাজের সূচনা হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পটুয়াখালী জেলাটি বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী সর্ব দক্ষিণের স্থান এবং এখন উন্নয়নের দ্বার হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে দেশের তৃতীয় পায়রা সমুদ্রবন্দর। দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য সবচেয়ে বড় পায়রা তাপ বিদ্যুেকন্দ্রটি এখানেই তৈরি হচ্ছে। এই বিদ্যুেকন্দ্রের প্রথম ইউনিট ইতিমধ্যেই উত্পাদনে এসেছে। দ্বিতীয় ইউনিট অল্প সময়ের মধ্যেই উত্পাদনে যাবে। এছাড়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর সমুদ্রসৈকত সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যটনের অন্যতম স্থান। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় পর্যটকরা কুয়াকাটায় যেতে ভোগান্তিতে পড়তেন। পায়রা সেতু চালু হলে দেশের যে কোনো স্থান থেকে সর্ব দক্ষিণ উপকূলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে। সড়ক পথের যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না।
এই সেতুটি ভূমিকম্প সহনীয় এবং সেতুটিতে রয়েছে ৩২টি স্প্যান আর ৩১টি পিলার। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লনজিংয়াল ব্রিজ অ্যান্ড রোড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ব্রিজটি নির্মাণ করছে। সেতুটি নির্মাণে ১ হাজার ৪৪৭ দশমিক ২৪ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট, ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট—এই প্রকল্পে যৌথভাবে পুরো টাকার যোগান দিচ্ছে। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৩৬৮ দশমিক ২৯ কোটি টাকা সরকারের এবং কুয়েতের ১ হাজার ৭৮ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই পুরো প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ এবং শুধু মূল সেতুর ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে বলে প্রকৌশলীরা ধারণা করছেন। সেতুর নির্মাণকাজের পাশাপাশি খরসে াতা পায়রা নদী শাসন ও তীর সংরক্ষণের কাজও এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪৪৭ দশমিক ২৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা প্রাথমিক মূল ব্যয়ের চেয়ে সাড়ে তিন গুণ বেশি। এ ছাড়া, প্রকল্পটি শেষ করতে নির্ধারিত সময়সীমার চেয়ে পাঁচ বছর বেশি সময় লেগেছে। মূলত প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতার ফলে সেতুর নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, দীর্ঘ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট সমস্যার কারণে সেতুটির জন্য হাজার হাজার মানুষকে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বরিশাল শহর থেকে পটুয়াখালী সদরের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার, পায়রা বন্দরের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার এবং কুয়াকাটার দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার। বর্তমান সরকার গত কয়েক বছরে বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে বেশ কয়েকটি সেতু নির্মাণ করেছে; কিন্তু মানুষকে ফেরি দিয়ে পায়রা নদী পার হতে হয়। এতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই সেতু চালু হয়ে গেলে মানুষ বরিশাল শহর থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে পটুয়াখালী জেলা সদর এবং দুই ঘণ্টায় নির্মাণাধীন পায়রা সমুদ্রবন্দরে যেতে পারবে। আর মাত্র আড়াই ঘণ্টায় জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায়ও যেতে পারবে তারা। এদিকে, দ্রুত এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে কক্সবাজারের চেয়ে কম সময়ে কুয়াকাটায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। কক্সবাজার যেতে যেখানে সময় লাগে ১০-১২ ঘণ্টা সেখানে কুয়াকাটায় পৌঁছানো যাবে মাত্র ছয় ঘণ্টায়, ফলে নিঃসন্দেহে পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে।
পায়রা সেতুর নির্মাণ সমাপ্তির মধ্য দিয়ে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার সঙ্গে সারা দেশের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগে এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগম একদিকে যেমন বাড়বে, তেমনি পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া এ অঞ্চলের উত্পাদিত দ্রব্যাদি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সহজতর হবে। যা এ অঞ্চলের জনসাধারণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যে চলমান মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন করে ইপিজেড করার কাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছে যা এক সময়ের অবহেলিত পটুয়াখালীকে বিপুল সম্ভাবনার দ্বারে রূপান্তরিত করবে। পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
n লেখক :ব্যাংকার
