দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে হঠাত্ করে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের শিশু মেডিসিন ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এ অবস্থা চলতে থাকায় বর্তমানে সেখানকার অনুমোদিত ৩৬ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির সংখ্যা প্রায় দেড় শ। বেডের তুলনায় কয়েকগুণ রোগী থাকলেও এ ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রারের চারটি পদের সবগুলোই শূন্য, অ্যাসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রারের ছয়টি পদের মধ্যে পাঁচটি পদই শূন্য ও ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ছয়টি পদের সবগুলোই শূন্য। এছাড়া কোনো ইন্টার্ন চিকিত্সক না থাকায় এ ওয়ার্ড পরিচালিত হচ্ছে চার জন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে।
শেবাচিম হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক ডা. এম আর তালুকদার মুজিব ইত্তেফাককে জানান, ওয়ার্ডের সবগুলো পদই প্রায় শূন্য থাকায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিত্সা ব্যবস্থা। বর্তমানে চার জন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীকে পালাক্রমে ডিউটি দিয়ে ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষকে বার বার লিখিতভাবে বিষয়টি জানালেও ফলাফল শূন্য। এ সংকটকালে শিশু বিভাগের আট জন সহকারী অধ্যাপকের ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক বলেন, তারা যে যার মতো পারছেন হাসপাতালে সময় দিচ্ছেন, আমিও সময় দিচ্ছি। তবে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন কয়েক জন শিশুর অভিভাবক জানালেন, বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিত্সকের দেখা পান না তারা। কেবল নার্স ও শিক্ষার্থীরাই মাঝে মধ্যে এসে খোঁজখবর নেন। আবার কয়েক জন অভিভাবক বলেন, যদিও বা দুই/এক জন চিকিত্সকের দেখা মেলে তাদের কাছে কোনো প্রশ্ন করলেই তারা ধমক দেন। বেশি কথা বললে ডাক্তারের সঙ্গে থাকা লোকজন হাসপাতালের বাইরে ডায়াগনস্টিকে চিকিত্সা নেওয়ার পরামর্শ দেন। শিশু বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভাগীয় প্রধান নিয়ম করে দৈনিক একবার হাসপাতালে এলেও ১৫০ থেকে ২০০ রোগীর মধ্যে কাউকেই চিকিত্সা দিতে পারেন না। অথচ আট জন সহকারী অধ্যাপক যদি নিয়ম করে দৈনিক সকাল-বিকাল শিশু বিভাগে আসতেন তাহলে তীব্র অসুস্থতা নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুরা কিছুটা হলেও চিকিত্সাসেবা পেত। মেডিক্যালে চিকিত্সক সংকটের দোহাই দিয়ে এসব সহকারী অধ্যাপক শিশু বিভাগে নামমাত্র চিকিত্সা দিয়েই ছোটেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে। কেউ ৬০০ আবার কেউ ৮০০ টাকায় এক দিনেই তিন/চারটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শতাধিক রোগী দেখছেন।
শেবাচিম হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শিশু রোগীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ছটফট করলেও তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। দিনে একবার কোনোরকমে দায়সারাভাবে সহকারী অধ্যাপকগণ এসে দেখে গেলেও রোগীর পরবর্তী সময়ে কী হলো না হলো তা দেখার সময় তাদের নেই। অথচ হাসপাতালের সামনেসহ পার্শ্ববর্তী বাংলা বাজার, সদর রোডসহ বিভিন্ন এলাকার ডায়াগনস্টিকে দিন-রাত সমান তালে চলছে তাদের চিকিত্সা। হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা না পেয়ে যাদের টাকা আছে তারা ছুটছেন ঐ সব ডায়াগনস্টিকে চিকিত্সা নিতে। অথচ গরিব-অসহায়দের জন্য সরকারি হাসপাতাল থেকে যাচ্ছে অবহেলিত। হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডের ন্যায় শিশু ওয়ার্ডেও রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিত্সকসহ তীব্র জনবল সংকটের মধ্যেও এ হাসপাতালে যতটুকু সেবা দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে চিকিত্সকসহ নানা সংকট থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, চিকিত্সকরা তাদের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের নাম-পদবি ব্যবহার করে বেসরকারিভাবে সার্বক্ষণিক চিকিত্সা দিয়ে থাকেন। কিন্তু গরিব-অসহায় মানুষের পক্ষে সেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে চিকিত্সা নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে শেবাচিমের শিশু বিভাগসহ সকল বিভাগের চিকিত্সকদের উচিত মেডিক্যালের রোগীদের বিষয়ে আরো কিছুটা যত্নবান হওয়া। কেননা সরকার তাদের বেতন-ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস পরিহার করে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবাদান ও সরকারি ওষুধ যথাযথভাবে বণ্টনের দাবি জানান তিনি।
