যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে এ বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ-২৬) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে এই শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিশাল অংশীদারিত্ব রয়েছে। জলবায়ু তহবিল পাওয়া ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের পুনর্বাসনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণসহ নানা কারণে বাংলাদেশের কাছে আসন্ন সম্মেলনে প্রত্যাশাও বেশি। এ বছরের জুনে উক্ত ‘কপ-২৬’ সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটিশ এমপি অলোক শর্মা ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়ে নানা আশ্বাস ও জলবায়ু তহবিলের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ায় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কার্যকর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা দরকার।
চারটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবারের জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করা হচ্ছে। ১. ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী কার্বন নিঃসারণের পরিমাণ একেবারে শূন্যতে নামিয়ে আনতে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমনের মাত্রা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা; ২. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং পুনরুদ্ধার করা, প্রতিরক্ষা ও সতর্ক ব্যবস্থা তৈরি, অবকাঠামো তৈরি ও কৃষি আরো স্থিতিস্থাপক করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; ৩. এসব কাজ সম্পাদনের জন্য প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল করার জন্য উন্নত দেশগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং ৪. জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আশা করা হচ্ছে এবারের সম্মেলনে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত (কপ-২১) সম্মেলনে ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি পূরণের দিকে বিশ্ব কত দূর অগ্রসর হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হবে। কার্বন নিঃসারণের মাত্রা ১ দশমিক ৫-এর মধ্যে রাখতে রাষ্ট্রগুলো যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আসলেই যেসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তার মধ্যকার বিদ্যমান পার্থক্য নিরসন। এছাড়া প্রায় এক দশক আগে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তার উদ্দেশ্যে ২০২০ সালের মধ্যে ধনী দেশগুলোর প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ এবং এর যথাযথ ব্যবহার নিয়ে হতে পারে সিদ্ধান্ত। সর্বশেষ ২০১৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত (কপ-২৫) সম্মেলন অনেকটা কার্যকর সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। এছাড়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রামপ প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা ছিল হতাশাব্যঞ্জক।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা বিশ্বকে নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলছে। একদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বন্যায় ভেসে যাচ্ছে, অন্যদিক শুকিয়ে দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে। চলতি বছরই ইউরোপ, নাইজেরিয়া, উগান্ডা আর ভারত ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। অন্যদিকে কানাডা, মাদাগাস্কার, সাইবেরিয়া পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। চীন আর জার্মানি তাদের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি গ্রাউন্ড-জিরো দেশ হিসেবে নিজের কর্মফলের চেয়েও বেশি মাত্রায় জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার। বর্তমান সময়ে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। তাছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে অনেক অঞ্চল ডুবে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের বসবাসের এই এলাকাগুলো ওই সব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্যোগ ঘন-ঘন হতে থাকবে। তাই উপকূলের মানুষের সুরক্ষার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবারের সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা হবে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ব্যাপারটা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। উন্নত দেশগুলোর বাইরে অন্যান্য দেশের খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা কম বলে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব এবং দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর ঝুঁকি বিবেচনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজস্ব অর্থায়নে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ক্লাইমেট ট্রাস্ট তহবিল গঠন করেছে। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই খাতে ব্যয় করবে আরো ৪ হাজার কোটি ডলার। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান ২১০০ প্রণয়ন করেছে। জলবায়ুবিষয়ক সর্বোচ্চ বিশ্ব ফোরাম, জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি)-এর কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (সিওপি)-এ ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ভয়াবহতা ও বাস্তবতা সামনে রেখে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আসন্ন সম্মেলনে বাংলাদেশের ন্যায্য অবস্থান গ্রহণে যথাযথ প্রস্তুতি প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় ও পরবর্তীকালে সেবা অব্যাহত রাখা, দুর্যোগে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় উপকরণের উত্স নিশ্চিতে বিনিয়োগসহ যুগোপযোগী নীতিনির্ধারণে উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দশকের শেষের দিকে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। এখনকার সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন তারা। সুতরাং কার্বন নিঃসারণ কমানো, জলবায়ুর ক্ষতি প্রশমন ও পুনর্বাসনে তহবিল নিশ্চিত এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বৈশ্বিক পরিবেশ বসবাস উপযোগী হিসেবে ধরে রাখার জন্য আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে শেষ হবে বলে আশা করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব মানুষ।
n লেখক :গবেষক
