কুমিল্লায় ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ তুলে গতকাল বুধবার শহরজুড়ে বিক্ষোভ, ধাওয়া পালটা ধাওয়া ও তিনটি পূজাম্লপে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ছুঁড়ে ও লাঠিচার্জ করে। এতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম তানভীর, কোতয়ালি মডেল থানার ওসি ও ডিবির একজন পরিদর্শক ছাড়াও অন্তত ২০ জন আহত হন। সকালে শহরের নানুয়া দিঘীর পাড় এলাকার একটি পূজাম্লপ থেকে পবিত্র কোরান উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এ ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নগরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে র্যাব, পুলিশ ছাড়াও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছে। এ ঘটনায় আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। গতকাল বিকালে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর খামারবাড়িতে পূজামন্ডপ পরিদর্শনকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কুমিল্লায় পূজামন্ডপে হামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, এ ঘটনায় যারাই জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে, কেউ ছাড় পাবে না।
সরেজমিন ঘুরে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর নানুয়া দীঘির পাড় এলাকায় সকালে লোকজন প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন। এ সময় তারা দীঘির উত্তর পাড়ে রাস্তার পাশের একটি পূজাম্লপে পবিত্র কোরআন দেখতে পান। ৯৯৯-এ কল করলে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ তাত্ক্ষণিকভাবে সেখানে গিয়ে পবিত্র গ্রন্থটি সরিয়ে আনেন। এ সময় ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে লোকজনের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হলে ঘটনাস্থলে ক্ষুব্ধ জনতার ঢল নামে। তারা এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কুমিল্লা সিটি মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কুসহ পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে যান এবং জনতাকে শান্ত থাকার আহবান জানান। জেলা প্রশাসক হ্যান্ডমাইকে ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু এতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পুলিশ টিয়ার শেল ও গুলি চালায়। এ সময় ধাওয়া পালটা ধাওয়া ও ইট পাটকেল নিক্ষেপে এলাকাটি অনেকটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এক পর্যায়ে নগরীর কান্দিরপাড়, মনোহরপুর, রাজগঞ্জ, চকবাজার, টমছমব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এ সময় ঘটনাস্থল নানুয়া দীঘিরপাড় এলাকার একটি, মনোহরপুর এলাকার একটি ও চকবাজার এলাকার একটি পূজাম্লপের গেট ভাঙচুর করা হয়। দুপুরের পর থেকে আতঙ্কে নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যানবাহন চলাচল এবং সড়কের পাশের দোকানপাট বন্ধ থাকে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। বিকালে নগরীতে ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, পূজাম্লপ থেকে পবিত্র কোরআন শরীফ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওই এলাকার সিসি ফুটেজ পরীক্ষা ও তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নগরীর পাড়া-মহল্লায় র্যাব, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দাঙ্গাবাজদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোটসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা
কমলগঞ্জে পূজামণ্ডপে ভাঙচুর
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার ঘটনার প্রতিবাদে কমলগঞ্জে জনতা মিছিল বের করে। এ সময় দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে দুটি পূজামণ্ডপের প্রতিমা ও পাঁচটি মণ্ডপের গেট ভাঙচুর করে। বুধবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় আজ সকাল থেকে উপজেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশেকুল হক।
জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে : কাদের
রাজধানীর কেআইবি প্রাঙ্গণে শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর শুভেচ্ছা প্রদান অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনায় যারাই জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে, কেউ ছাড় পাবে না। তিনি কুমিল্লার ঘটনা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাজ উল্লেখ করে বলেন, যারা মন্দিরে হামলা চালায় তারা দলীয় পরিচয়ের হলেও ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যারা নষ্ট করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দুর্বৃত্ত যাতে মন্দিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা হামলা করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
