উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ক্ষীণদৃষ্টি সমস্যা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ২২:৪০

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে চোখের ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা। এক দশক আগেও ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের এমন অবস্থা দেখা না গেলেও বর্তমানে স্মার্টফোন, ট্যাব ও ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহারে বড়দেরসহ শিশুদেরও এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের চোখে অতিরিক্ত স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি বড়দের চোখের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ চোখের রোগে ভুগছেন, যাদের মধ্যে ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ দৃষ্টিহীন। বাকি ২৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষ স্বল্প দৃষ্টি কিংবা চোখের অন্য কোনো রোগে ভুগছেন। মোট চোখের রোগীর দুই-তৃতীয়াংশই নারী। বর্তমানে যেসব চোখের রোগে মানুষ ভুগে থাকেন, তার ৮০ শতাংশ নিরাময়যোগ্য।

এমন পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব দৃষ্টি দিবস। পৃথিবীর দৃষ্টি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর জন্য প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব দৃষ্টি দিবস’ পালন করা হয়। বিশ্বব্যাপী চোখের যত্ন নেওয়ার জন্য গণসচেতনতা তৈরি, চক্ষু রোগ নির্মূলে প্রভাবিত করা, চোখের যত্ন নেওয়ার তথ্য জনগণের কাছাকাছি আনাই বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের লক্ষ্য। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে। এ বছর বিশ্ব দৃষ্টি দিবসে ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস’- (আইএপিবি) এর প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘আপনার চোখকে (দৃষ্টি) ভালোবাসুন’।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বা সারা বিশ্বে সাতটি কারণে মানুষ অন্ধ হয়। একটি হল বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, দ্বিতীয়টি হল গ্লুকোমা। গ্লুকোমা হতে পারে (ওপেন অ্যাঙ্গেল বা ক্লোজড অ্যাঙ্গেল) ছানি, যা প্রতিরোধযোগ্য, ডায়াবেটিক হলে অনেকের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হয়। এর জন্য অন্ধত্ব হয়। আঘাতজনিত কারণেও অন্ধত্ব হয়। আর বিদেশে ট্রাকোমা অন্ধত্বের অন্যতম একটি কারণ। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে আমাদের দেশে আগে অনেকেই অন্ধত্ব বরণ করত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ন্যাশনাল আই কেয়ারের মাধ্যমে, ইপি আইয়ের মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করায়, রাতকানা রোগ কমে গেছে। আশা করা হচ্ছে কৃষকদের ফ্রি চশমা প্রদানের মাধ্যমে কর্নিয়াল আলসারের মতো ভয়াবহ রোগ থেকে তারা মুক্তি পাবেন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অন্ধত্বের যে সাতটি কারণ আছে যেমন ছানি বা আঘাত, ট্রাকোমা, রিফ্রাক্টিভ এরোর, এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন এবং গ্লুকোমা অন্যতম। তারা বলেন, ভিশন সেন্টারের মাধ্যমে গ্রাম অঞ্চলে রোগীদের যদি গ্লুকোমা স্ক্রিনিং করা যায়, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আছে কি না, ছবি তুলে যদি টারশিয়ারি লেভেল হসপিটালে পাঠানো যায়, তাহলে আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধত্ব দূরীকরণ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা যদি অন্ধত্ব নিবারণ করতে চাই তাহলে আমাদের কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ছোট মাছ, শাকসবজি ও হলুদ ফলমূল খেলে চোখের দৃষ্টি বাড়ে। প্রতি ২০ মিনিট পর পর মোবাইল বা ল্যাপটপ বা টেলিভিশন দেখার পর ২০ ফুট দূরে ২০ সেকেন্ড তাকালে চোখের ব্যথা ও মাথাব্যথা দূর হবে। প্রতিনিয়ত চোখের যত্ন নিতে হবে বা চোখের যত্নে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া বা চশমার প্রয়োজন আছে কি না, চোখের কোনো সমস্যা আছে কি না, এগুলো নিয়মিত চেকআপ করা দরকার। কারো পরিবারের চোখের সমস্যা আছে কি না, পরিবারের কাছ থেকে জানতে হবে। পুষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত ব্যায়াম করা দরকার। যে সব খাবার খেলে ডায়াবেটিক হয়, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি হয় সেসব খাবার বর্জন করা। ব্ল্যাড প্রেশার স্বাভাবিক রাখা ও গ্লুকোমা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। গ্লুকোমার ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করতে হয়। কোনো ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে যখন-তখন ব্যবহার করলে চোখের প্রেশার বেড়ে যেতে পারে বা চোখের ক্ষতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ আবশ্যক।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান আনজুম বলেন, আগে চিকিত্করা দিগন্তের দিকে তাকাতে বা সবুজের দিকে তাকাতে বলতেন। কারণ দিগন্তের দিকে তাকালে দূরের দৃষ্টিটা প্রসারিত হয়, দৃষ্টি ভালো থাকে। কিন্তু এখন শিশুরা চার দেওয়ালে আবদ্ধ। ঘরে বসে বসে তারা ট্যাব, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের স্ক্রিণে আবদ্ধ। স্কুলে মাঠ নেই এটাও শিশুদের এই ক্ষীণ দৃষ্টির একটা কারণ। তিনি আরো বলেন, শিশুদের রোদে মাঠে খেলতে দিতে হবে এবং ট্যাব মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে হবে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, যারা দূরে দেখতে পারে না, এ ধরনের চোখের ত্রুটিকে বলে ‘ক্ষীণ দৃষ্টি’ বা ‘মাইয়োপিয়া’। যে শিশুরা দূরেও কম দেখে কাছেও কম দেখে, এ ধরনের ত্রুটিকে বলা হয়—‘হাইপারমেট্রপিয়া’। আরেক ধরনের চোখের সমস্যা নিয়ে শিশুরা আসে, যাদের আমরা বলি ‘এস্টিগমেটিজম’।