আশ্চর্য স্মৃতিবিধুর ‘স্বর্গ’

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ২০:২০

উদ্বাস্তু বা শরণার্থীর ভেতর চিরকালীন একটা অস্থিরতা থাকে, কোনো দিন তা যায় না। নিজের জীবনে যতই স্থির হোক না কেন, তবুও সেই অস্থিরতা ফুরাবার নয়। নিজ-ভূমি হারানোর জ্বালা এবং পরের ভূমিকে আপন করতে না পারার ছটফটানি কখনো যায় না। বারবার তার দিকে আঙুল তুলে দেওয়া হয়—তুমি বহিরাগত, তাই খিড়কি খোলা, চলে যাও। কিন্তু পালাবার তো পথ নেই!

এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ তেমনি এক শরণার্থী। ব্রিটেনে বসবাস করেন, কিন্তু তাঁর শেকড় আফ্রিকায়। সুইডিশ অ্যাকাডেমি বলেছে, আবদুলরাজাক গুরনাহর আপসহীন ও দরদি লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের নানা কষ্ট-ব্যঞ্জনার গল্প ফুটে উঠেছে। ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করা আবদুলরাজাক তানজানিয়ায় বেড়ে উঠলেও ১৯৬০ সালে শরণার্থী হিসাবে ব্রিটেনে যান। অবসর গ্রহণের আগে পর্যন্ত তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। ব্রিটেনে পাড়ি দেওয়ার পর ২১ বছর বয়সে প্রথম ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেন। ব্রিটেনভিত্তিক এই লেখক ২০০৭ সালে জিম্বাবুয়ে ডরিস লেসিং-এর পর প্রথম কোনো আফ্রিকান হিসাবে নোবেল পেলেন। তিনি পঞ্চম আফ্রিকান লেখক যিনি সাহিত্যে পেলেন এই পুরস্কারটি। দক্ষিণ আফ্রিকার জন এম কোয়েটজি ২০০৩ সালে এবং সেখানকারই নাদিন গোর্ডিমার ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পান। তার আগে নোবেল পান মিশরীয় লেখক নাগুইব মাহফোজ ১৯৮৮ সালে এবং নাইজিরীয় ওলে সোয়িঙ্কা ১৯৮৬ সালে। কিন্তু চারজনের মধ্যে একমাত্র ওলে সোয়িঙ্কা ছাড়া কেউই কৃষ্ণাঙ্গ নন।

আবদুলরাজাকের মাতৃভাষা সোয়াহিলি। এই ভাষায় তানজানিয়াসহ পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বহু মানুষ কথা বলেন। নোবেল ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, তাঁর শিক্ষাসময়ের কাজেও রয়েছে উপনিবেশ-পরবর্তী, অভিবাসীদের নিয়ে অনেক কিছু। সালমান রাশদি, সোয়িঙ্কাদের সারিতেই তাঁকে অনেকে ফেলে থাকেন। তাঁর দেশের মানুষ তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুললেও রাজাক বলেছেন, ‘আমার পরিবার এখনো সেখানে (তানজানিয়ায়) বেঁচে আছে। আমি সেখানে যখন ইচ্ছা যেতে পারি। আমার এখনো সেখানে যোগাযোগ রয়েছে। আমি সেখান থেকেই এসেছি। আমি মানসিকভাবে সেখানেই থাকি।’

আবদুলরাজাকের উপন্যাসের সংখ্যা ১০টি। এর মধ্যে তাঁর চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’(স্বর্গ)-এর জন্যই এবার তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অস্কার ওয়াইল্ড বলেছিলেন, ‘কোনো বই নৈতিক বা অনৈতিক হয় না। সুলিখিত হয়, কিংবা বাজে লেখা হয়।’ অর্থাত্ বইটা কেমন লেখা হয়েছে, শুধু তার ভিত্তিতেই সেটিকে বিচার করা উচিত। রাজাকের ‘প্যারাডাইস’ (স্বর্গ) উপন্যাসটিও তেমনি সুলিখিত; এ ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ নেই। কেনিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহামেদ বাকারি বলেছেন, আবদুলরাজাক গুরনাহর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আফ্রিকান লেখকদের একটি নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা নিঃসন্দেহে। আপনি যদি অত্যধিক অনুভূতির উপহাস এবং বর্তমানের উপলব্ধি হারানোর করুণ অবস্থা উপভোগ করতে চান, তাহলে আবদুলরাজক গুরনাহর লেখা পড়ে কখনোই হতাশ হবেন না। তাঁর দশটি উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিপার্চার (১৯৮৭), পিলগ্রিমস ওয়ে (১৯৮৮), প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১), ডিসার্শন (২০০৫), গ্র্যাভেল হার্ট (২০১৭) এবং সাম্প্রতিকতম উপন্যাস আফটার লাইভস। বেশির ভাগ উপন্যাসে মূল চরিত্র হয়ে উঠেছে কোনো আফ্রিকান আরব, যে চরিত্র মূলচ্যুত হয়ে নতুন এলাকায় এসে নতুন সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখছে, খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে চলেছে নব-অবস্থানে, তারই বয়ান।

তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’, যা বুকার পুরস্কারের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিল, উপন্যাসটি ১২ বছর বয়সি ইউসুফকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ইউসুফের জন্ম তানজানিয়ার মফস্সল শহর কাওয়ায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ইউসুফের বাবা, ঋণে জর্জরিত, বাধ্য হয় আজিজ নামে এক আরব ব্যবসায়ীর কাছে বিনা বেতনে কাজ করতে। আজিজের ক্যারাভানে ইউসুফ মধ্য আফ্রিকা, কঙ্গো অববাহিকায় ঘুরতে থাকে। নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় সে। পূর্ব আফ্রিকায় ক্যারাভ্যান ফিরে যখন এলো, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু। জার্মান সেনার তানজানিয়ায় দাপটও চলছে। জার্মানরা অফ্রিকান পুরুষদের জোর করে তাদের বাহিনীতে ঢোকাচ্ছে। আজিজের ক্যারাভ্যান জার্মান সেনার কোপে পড়ে গেল সে সময়। এক আশ্চর্য স্মৃতিবিধুর মায়াবী ভাষায় লিখেছেন আবদুলরাজাক। তাঁকে অভিনন্দন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার জন্য।

 সাহিত্যে নোবেল ১৯০১-২০২১

g  ১১৪ মোট পুরস্কারের সংখ্যা

g  ১১৮ মোট প্রাপক

g  ১৪ নারী বিজেতা

g  ৭ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা

     করা হয়নি।

g  প্রাপকদের গড় বয়স ৬৫ বছর।

g  ৪১ বছর বয়সে নোবেল পেয়েছিলেন সাহিত্যের

     তরুণতম বিজেতা রুডইয়ার্ড কিপলিং।

g  ৮৮ বছর বয়সে নোবেল পান প্রবীণতম সাহিত্যের

     নোবেল বিজেতা ডরিস লেসিং।

g  ১৯৫৩ সালে সাহিত্যে ‘সুবক্তা’ হওয়ার জন্য                                  নোবেল পেয়েছিলেন তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী                                

     উইনস্টন চার্চিল।

g  ২ জন সাহিত্যিক নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেননি।

g  ১৯৫৮ সালে প্রথমে সম্মত হয়েও পরে সোভিয়েত                            ইউনিয়নের চাপে পুরস্কার নেননি বরিস                                             পাস্তারনাক।

g  ১৯৬৪ সালে পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার

     করেন জঁ পল সার্ত্র। কেতাবি খেতাব নিতে তাঁর                              

     অনীহা ছিল।