সাময়িকপত্রের ইতিহাসে সৃজনপ্রয়াসী মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘লোকায়ত’ বাঙালির জ্ঞান-চর্চার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে,—বলা চলে যুগ-সন্ধিক্ষণে কালের দাবি পূরণ করার লক্ষ্যে আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৯৮২ সনের অক্টোবর মাসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের সময়ে, কিন্তু এর প্রস্তুতি চলছিল তাঁরও পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকের নৈরাজ্যের কালে।
লোকায়তর প্রাণপুরুষ বা প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি জানিয়েছেন: ‘অন্তত সাড়ে চার বছর আগে এই পত্রিকা প্রকাশের অনুমতির জন্য আমরা আবেদনপত্র পেশ করেছিলাম। .. ..চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি, অনুমোদন আমরা লাভ করেছি।’ কিন্তু অনুমোদন লাভের সে-প্রচেষ্টার মধ্যেও ছিল কিছুটা কৌশল। সম্পাদক ও প্রকাশক হিসাবে নিজের নাম ব্যবহার করেননি তিনি। করেছিলেন অলেখক, তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’ নন—এমন দুজন শিক্ষিত ব্যবসায়ী ধনাঢ্য বন্ধুজনকে। তিনি জানতেন ভালো করেই যে, তাঁর নামে কোনো মাসিক পত্রিকার ডিক্লারেশন পাওয়া যাবে না। ষাট ও সত্তর দশকের রাজনৈতিক-সাহিত্যিক কার্যক্রম দ্বারা ইতিমধ্যেই তিনি ‘স্বতন্ত্র ধারার মুক্তবুদ্ধির যুক্তিবাদী লেখক’ হিসেবে বাংলার বিদ্বত্সমাজে খ্যাতিলাভ করেছিলেন।
লোকায়তর প্রথম সংখ্যার লেখক ও লেখা ছিল—আহমদ শরীফের ‘উনিশ শতকের বাঙলার জাগরণের স্বরূপ’, আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘নৈতিক চেতনা ও আমাদের স্বাধীনতা’, মনসুর মুসার ‘বাঙলা প্রচলনসংক্রান্ত বিবেচনা’, বিনোদ দাশগুপ্তের ‘পাঠক লেখক পঠনসামগ্রী ও অন্যান্য বিবেচনা’ এবং আকমল হোসেনের ‘প্যালেস্টাইন সমস্যার গতি-প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ। মাত্র পাঁচটি রচনা দিয়ে এক নম্বর কর্ণফুলি সাদা কাগজে ডিমাই চার ফর্মা—চৌষট্টি পৃষ্ঠার আকার নিয়ে লোকায়তর প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা আত্মপ্রকাশ করে।
শিল্পী সৈয়দ লুত্ফুল হকের সুশোভন প্রচ্ছদমণ্ডিত ‘লোকায়ত’ শিক্ষিত সংস্কৃতজনকে চমকিত করে দিয়েছিল। কারণ এমন সুমুদ্রিত সব্যাখ্যাত আদর্শাভিমুখ সাহিত্যপত্রিকা বাংলাদেশের সাহিত্যসমাজে ছিল তখনো পর্যন্ত দুর্লভ, অনুপস্থিত।
লোকায়তের প্রথম সংখ্যার পাঁচটি রচনাই এর বহুমুখী আদর্শ-লক্ষ্যকে অভিব্যক্তি দিতে পেরেছিল বলে মনে করি।
লোকায়তের প্রথম সংখ্যায় কোনো গল্প-কবিতা স্থান না-পাওয়ায় ধারণা তৈরি হয়েছিল, শুধুই চিন্তাচর্চার সাহিত্যের দার্শনিক বা সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের পত্রিকাই হবে লোকায়ত। কিন্তু পরবর্তী সংখ্যায় একজন অপরিচিত লেখক শেফালী আকতার শেলীর ‘অরিন্দম’ শীর্ষক একটি গল্প ছেপে জানিয়ে দেয়া হয়—লোকায়ত নতুন লেখকদের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রও বটে! পরেপরে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কবিতা, গল্প, আলোচনা, লোকায়তে মুদ্রিত রচনার পাঠ-প্রতিক্রিয়া ও বিদেশি সাহিত্য থেকে অনূদিত রচনাবলি প্রকাশ করে লোকায়ত বাংলাদেশের সাহিত্যসমাজে অনেক লেখক সৃষ্টি করেছে। দেখা যায়, এদেশে পড়তে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের মূল জার্মান জাপান বা চীনা ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করা গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা ও বিচিত্র উত্কৃষ্ট বিশ্বসেরা সাহিত্য লোকায়তে প্রকাশ করা হচ্ছে। ইংরেজি ভাষা থেকে অনূদিত হয়েছে কার্ল মার্কসের কমিউনিজমের মূলনীতি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের তরুণদের উদ্দেশ্যে দেয়া আন্তরিক উপদেশাবলি, বার্ট্রান্ড রাসেল, মাও সেতুঙ, লেনিন, আইনস্টাইন, পাবলভ কে না আছেন মহত্ লেখক যিনি লোকায়তর পৃষ্ঠায় বাংলাভাষায় উপস্থাপিত হননি?
লোকায়তর ভাবার্থ লোক=পাবলিক অর্থাত্ গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা—, একে মূর্ত করে তোলার সাধনাই ছিল লোকায়তর সাধনা। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক অনেক প্রতিকূলতা ও বৈরী ঘটনা উপেক্ষা করে পত্রিকাটিকে পরিণতিদানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনিয়মিতভাবে কিছুদিন বিভিন্ন তরুণ সাহিত্যকর্মীর সহযোগিতায় প্রকাশের একপর্যায়ে এটির প্রকাশনা স্থায়ীভাবে স্থগিত করে দিয়েছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যে সমাজে সংস্কৃতির ইতিহাসে লোকায়ত রেখে গিয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করার মতো অমূল্য রচনাসম্ভার।
