রসুল (স)-এর মহান আদর্শ

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ২০:৩৯

আরবি মাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য হলো রবিউল আউয়াল। ঐতিহাসিক এই মাসে সাইয়েদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন হজরত মুহাম্মদ (স) এই ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ (মতান্তরে ৯, ১০) তারিখে মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। আবার এই মাসেরই ১২ তারিখ সোমবার ৬৩ বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এই মাস অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। নবি করিম (স)-এর দীর্ঘ জীবন তার উম্মতের জন্য জীবন ধারণের সর্বোত্তম আদর্শ। সত্যিকার অর্থে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার অর্থ হলো, তিনি যেসব গুণে গুণান্বিত ছিলেন, সেগুলোর চর্চা করা এবং নিজের মাঝে সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং যেসব বিষয় তিনি পরিহার করেছেন ও পরিহার করতে বলেছেন তা পরিহার করা। এই মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দিনকে তোমরা আঁকড়ে ধরো আর যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করো।’ (আল হাশর :৭)।

রসুল (স)-এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এ প্রসেঙ্গে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা পরকালে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (আল আহযাব :২১)।

মহানবি (স)-এর ৬৩ বছরের জিন্দেগিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগ হলো তার জন্মের পর থেকে নবুয়ত লাভের আগ পর্যন্ত, অর্থাত্ ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় ভাগ নবুয়ত লাভের পর থেকে বাকি জীবন। প্রথম ভাগের জীবনকে বলা হয়েছে নবুয়ত লাভের দলীল। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী ছোট থেকেই তার কিছু লক্ষণ দেখে প্রতীয়মান হয় যে তিনিই হবেন আখেরি জামানার শেষ নবি। তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়, ছোটবেলা থেকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সাধারণত ছেলেমেয়েদের সামান্য কাপড় পরিধান করে বা বস্ত্রহীন করে রাখা হয়। কিন্তু মুহাম্মদ (স)কে ছোটবেলা থেকেই উলঙ্গ অবস্থায় রাখা যায়নি। উলঙ্গ করতে চাইলেই চরমভাবে কান্না করতেন। আবার তাঁকে কখনো গান-বাজনার আসরে রাখা যায়নি বা জোর করে নিয়ে গেলেও আল্লাহর অসীম ক্ষমতায় উনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যেতেন। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও কেউ তার ঘুম ভাঙাতে পারেননি। কিন্তু ঐ আসর বা অনুষ্ঠান শেষ হলেই আল্লাহর ইচ্ছায় উনি জাগ্রত হতেন। এছাড়া তার শৈশবকাল থেকে আমাদের অনেক বড় একটা শিক্ষা নেওয়া বাকি আছে। আমরা জানি তার জন্মদাত্রী মা আমেনা হলেও দুধমা ছিলেন হালিমা। নবি (স)-এর জীবনীতে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি ছোট্ট মুহাম্মদকে দুধ পান করাচ্ছিলেন, এক স্তন পান করানো হলে মা হালিমা আরেক স্তন পান করানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু উনি বারবারই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি মা হালিমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় যেন বলছিলেন, মা আমাকে জোর করছ কেন! আমার ভাগেরটা আমি পান করে ফেলেছি। বাকিটা আমার দুধভাইয়ের জন্য।

এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, নবি (স) শিশু অবস্থায়ও নিজের ভাইয়ের হকটুকু রক্ষা করেছেন। আর বর্তমানে আমাদের সমাজে এক ভাই আরেক ভাইয়ের ভাগের জমি কীভাবে কেড়ে নেওয়া যায় সেই চিন্তায় মগ্ন। আবার সেই ছোট্টবেলা থেকেই মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ তার সততা আর নিষ্ঠার কারণে গোটা মক্কায় আল-আমিন (বিশ্বাসী) নামে পরিচিত ছিলেন। কথা দিয়ে কথা রাখতেন, কোনো অবস্থাতেই আমানতের খেয়ানত করতেন না। কিন্তু  আমাদের মুসলিম সমাজে কীভাবে অন্যকে মেরেধরে, আরেক জনের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতা করছি। নিজেদের মধ্যে না আছে নবি (স)-এর আদর্শ আর না আছে নবির সুন্নাত। শুধু ঈদে মিলাদুন্নবি পালনের নামে মসজিদে ঘটা করে খাওয়ার আয়োজন, অনুষ্ঠান করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। নিজের মধ্যে নবির প্রতি মুহাব্বত পয়দা করতে হবে। তার আদর্শ অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করতে হবে।

তার জীবনের দ্বিতীয় তথা শেষ ভাগ হচ্ছে নবুয়তপ্রাপ্তির পরবর্তী জীবন। হেরা গুহায় ধ্যানে থাকা অবস্থায় সুরা আলাকের প্রথম তিন আয়াত নিয়ে হাজির হলেন জিবরাইল (আ)। শুরু হলো কুরআন নাজিল। এরপর বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্রমানুসারে দীর্ঘ ২৩ বছরে গোটা কুরআন তার ওপর নাজিল হয়েছে। এরপর থেকে শুরু করলেন ইসলাম প্রচার বা দিনের দাওয়াত। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি অনেক অপমানিত, লাঞ্ছিত হলেও আল্লাহর নির্দেশে তিনি সর্বদা ধৈর্য ধারণ করেছেন। ধৈর্য ধারণ একটি মহত্ গুণ, যা সবার মধ্যে বিদ্যমান থাকে না। তিনি নবুয়ত লাভের ১৩ বছর পর, অর্থাত্ ৫৩ বছর বয়সে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। কিন্তু এখানেও কাফির-মুশরিকেরা তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আর এই সময়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে জিহাদের। সুতরাং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের কথা চিন্তা করে, নবি (স)-এর জীবনাদর্শ সঠিকভাবে বুঝে, তার দেখানো আল্লাহর দিনের পথে সঠিকভাবে জীবনযাপন ও মহান আল্লাহ পাকের হুকুম পালন করার তৌফিক দান করুন।

lলেখক :শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী