ব্লকচেইন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা 'আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড'। গত ৮, ৯ ও ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলো প্রতিযোগিতাটির ২০২১ সালের আসর। শুরুর পর খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই প্রতিযোগিতার চতুর্থ আসরের আয়োজক দেশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ।
এই প্রতিযোগিতায় মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নিয়েই ১২ টি দেশের ৫০ টিরও অধিক দলের মধ্যে বাংলাদেশ একটি সিলভার ও সেরা প্রোটোটাইপ অ্যাওয়ার্ডসহ মোট চারটি পুরস্কার অর্জন করে। আর এতে মাত্র দুইবার অংশগ্রহণে দুইবারই সেরা প্রোটোটাইপ অ্যাওয়ার্ড গেছে বাংলাদেশের দল 'ডিইউ নিমবাস' এর ঝুলিতে। দুইবারের রৌপ্যপদকও বাংলাদেশেরই, তবে তা ভিন্ন দুই দলের দখলে।
এবারের আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডের রৌপ্যপদক অর্জন করেছে বুয়েট ও ঢাবি শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত দল ‘Team Hopefully, Hypothetically, Theoretically'। দলের সদস্যরা হলেন অনিরুদ্ধ গাঙ্গুলি (সিএসই-১৬, বুয়েট), তাসিন ইশমাম (সিএসই-১৬, বুয়েট), খন্দকার আফতারুল ইসলাম (সিএসই-১৬, বুয়েট), ফাহিম মুর্শেদ (ওএসএল-১৬, ঢাবি)।
টানা দুই-দুইবার বেস্ট প্রোটোটাইপ অ্যাওয়ার্ড পাওয়া 'ডিইউ নিমবাস' দলের সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাহলিল, মো আতিকুর রহমান ও মৃধা মো নাফিস ফুয়াদসহ ঢাবি আইবিএর প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী।
শুরুতেই টানা দুইবার এমন ঈর্ষণীয় সাফল্যের গল্প শুনে আসা যাক এই চার তরুণের মুখে। এই যাত্রার শুরুর গল্প জানতে চাইলে, মো. আতিকুর রহমান বলেন, 'বিভিন্ন সোর্স ঘেঁটে আমি আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড সম্পর্কে জানতে পারি, এরপর তাহলিল ভাই ব্লকচেইন নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ করেছে এটা জেনে ভাইকে এই ব্যাপারে অবহিত করি। এরপর সময়ের পরিক্রমায় দলের সাথে যুক্ত হয় সোহরাওয়ার্দী ভাই ও ফুয়াদ।'
নিমবাস দলের এবারের প্রজেক্টের নাম ছিল 'ব্লকচেইন বেজ্ড ফাইন্যানশিয়াল য়াল ইনক্লুশন প্রজেক্ট'। এই প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা নিয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, 'বাংলাদেশের বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আকাশছোয়া ক্ষুদ্রঋণের যাঁতাকলে পড়ে সুদের বোঝা টানতে টানতে জীবন পার করতে হয়। অন্যদিকে ব্যাংকে অর্থ জমানো বিশাল অংশের মানুষও পর্যাপ্ত মুনাফা পায় না। এই দুই বিশাল জনগোষ্ঠীর কষ্টের লাঘব ঘটাবে আমাদের প্ল্যাটফর্ম। এটি কোটি কোটি গ্রামীন মানুষকে সুদ থেকে মুক্তি দিয়ে ব্লকচেইন টোকেনের মাধ্যমে অগ্রিম পণ্য কেনার সুযোগ করে দেবে, যাতে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ও লাভবান হবে।'
এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সাপোর্ট আর চ্যালেঞ্জের ব্যাপারে দলনেতা তাহলিল বলেন, 'একদম শুরু থেকেই ড. বিএম মইনুল হোসেন স্যার আমাদের অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড কমিটিও জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ীদের প্রশিক্ষণ এবং মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা আমাদের এই অর্জনে বেশ সহায়তা করেছে।' বাংলাদেশে ব্লকচেইনের ব্যাপক সম্ভাবনা ও সরকারের ব্লকচেইন বিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করে তিনি। যেহেতু বাংলাদেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্রঋণ এবং আর্থিক সমস্যার সমাধানে কাজ করবে এই প্ল্যাটফর্ম, কাজেই প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে সরকারের সহায়তা আশা করছে ডিইউ নিমবাস দলের সদস্যরা।
পরপর দুইবারই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করার ও সাফল্যের অনুভূতি নিয়ে নাফিস ফুয়াদ বলেন, 'দলের নতুন সদস্য হিসেবে আমার আসলে প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো অর্জন এটাই, এর জন্য ভালোলাগাটা খানিকটা বেশিই। আর আশেপাশের সব মানুষের অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসায় আমরা সিক্ত।' পরবর্তীতে যারা নতুন এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন তাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যবসায় শিক্ষা দুই ধরণের মানুষ নিয়ে দল গঠন করার উপর পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ স্নাতক মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী।
সদ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত এই দলের কাছে তরুণ প্রজন্মের জন্য পরামর্শ হিসেবে কোনো বার্তা চাওয়া হলে, তাহলিল বলেন , 'পরিকল্পনামাফিক কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে।' সাথে দলের অন্য দুই সদস্য সোহরাওয়ার্দী ও নাফিস ফুয়াদ যুক্ত করেন, 'যে কোনো একটি বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে বড় অর্জনের স্বপ্ন দেখতে হবে।'
ইত্তেফাক/এসটিএম
