কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ ও কয়েকটি জেলায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানপাট এবং কমপক্ষে ১০টি মন্দির ও বাড়িতে হামলা হয়েছে। এতে বেগমগঞ্জ থানার ওসিসহ অর্ধশতাধিক আহত ও এক জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও সিলেটে তিন পূজামণ্ডপে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে মুসল্লিদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে বাধা দেয় পুলিশ। তখন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও সাউন্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে পাঁচ জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজের আগেই দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর পাশের একটি গেট বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এতে নামাজ পড়তে আসা একদল মুসল্লি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। নামাজ শেষে ঐ গেটের তালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন তারা। বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে মিছিল বের করেন। মিছিলটি মালিবাগের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ নাইটেঙ্গেল মোড়ে ব্যারিকেড দেয়। এ সময় উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হলেও এতে হেফাজতে ইসলামসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশ নিতে দেখা গেছে। বিক্ষোভ থেকে কুমিল্লায় কোরআন অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবির পাশাপাশি হেফাজতের সাবেক নেতা মাওলানা মামুনুল হকসহ সংগঠনটির নেতাদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা ও তাদের মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় ১০ মিনিট পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। এতে পল্টন, কাকরাইল, বিজয়নগর ও ফকিরাপুল এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আব্দুল আহাদ বলেন, বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছোড়ে। তখন পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ধাওয়া দেয় এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. বায়জিদুর রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ মিছিল থেকে পাঁচ জনকে আটক করেছে। বেলা আড়াইটার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যান চলাচল শুরু হয় বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, শুক্রবার দুপুরে নগরীর ডিআইটি জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে কয়েক হাজার মুসল্লি মিছিল বের করেন। মিছিলটি চাষাঢ়া এলাকায় গেলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পুলিশ কয়েক জনকে ধাওয়া দিয়ে ধরে দেহ তল্লাশি করে।
চৌমুহনীতে মিছিল থেকে হামলা, ১৪৪ ধারা
নোয়াখালী প্রতিনিধি ও সেনবাগ সংবাদদাতা জানান, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টার দিকে জুমার নামাজ শেষে চৌমুহনী শহরের বিভিন্ন মসজিদ থেকে কয়েক হাজার মুসল্লি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়কের উত্তর পাশের শ্রী কৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, রামকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানের সাইবোর্ড দেখে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। একপর্যায়ে তারা শহরের কলেজ রোডে ঢুকে পড়ে আশপাশের অনেক দোকানে এবং রাম ঠাকুর আশ্রম, রাধা মাধব জিওর মন্দির, ইস্কন মন্দিরসহ কমপক্ষে ১০টি মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর চালায় ও অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া বিভিন্ন বাসাবাড়ি লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। মন্দিরের সামনে ও আশপাশে থাকা লোকজনকে গণহারে পিটিয়ে আহত করে। এ সময় ইস্কন মন্দিরে থাকা যতন সাহা (৪২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। তিনি ঐ মন্দিরে থাকতেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান জানান, নতুন করে সহিংসতা এড়াতে শনিবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চৌমুহনী পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এলাকায় বিজিবি, র্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। তিনি জানান, হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় একজন জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছে। তবে মৃত্যুর বিষয় তিনি নিশ্চিত করেননি।
তবে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আরএমও সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম জানান, বিকালে চৌমুহনীতে হামলার ঘটনায় যতন সাহা নামের এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। এ ছাড়া চার পুলিশসহ পাঁচ জনকে আহত অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম ও সিলেটে আক্রান্ত আরো তিন পূজামণ্ডপ
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, শুক্রবার দুপুরের পর আন্দরকিল্লা মোড় থেকে একদল অল্প বয়সি তরুণ মিছিল করে জে এম সেন হলের সামনে পূজার গেট ভাঙচুর করার চেষ্টা চালায়। পুলিশ মিছিলকারীদের ধাওয়া করলে তারা কদম মোবারক এতিমখানার দিকে চলে যায়। এর পরপরই পূজা প্রাঙ্গণে আগত বিক্ষুব্ধ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আন্দরকিল্লা মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাতে থাকেন। সমাবেশে পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দও যোগ দেন। সমাবেশ থেকে দুষ্কৃতকারীরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিমা বিসর্জন বন্ধ রাখা এবং ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মহানগরী পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশিষ কুমার ভট্টাচার্য ইত্তেফাককে জানান, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রমুখের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে তারা ধর্মঘট কর্মসূচি থেকে সরে এসে প্রতিমা বিসর্জন করেছেন।
সিলেট অফিস জানায়, জুমার নামাজ শেষে একটি মিছিল থেকে মদিনা মার্কেট কালীবাড়ী হালদারপাড়া এলাকায় দুটি পূজামণ্ডপে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার বেলা ২টার পর ভাটিবাংলা অগ্রদূত যুবসংঘের ও উদীয়মান ভাটিবাংলা পূজামণ্ডপে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় প্রতিমার কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও দুই জন স্বেচ্ছাসেবক আহত হয়েছেন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
