রাজনৈতিক বিবেচনা বিচারের আওতায় আনা উচিত নয়

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ২২:১৫

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের অবৈধ সম্পদ মামলার রায়ে আদালত বলেছে, রাষ্ট্র অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন করে তার কৃত অপরাধের নিরীখে। আসামির ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। এটা হওয়াও উচিত নয়। এই বিষয়ে আমাদের সংবিধানের ২৮(১), ২৭, ৩১, ৩২ ও ২১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এর বিচারক মো. শহিদুল ইসলাম দুর্নীতি মামলার সাজার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন।

দুর্নীতির এই মামলায় আসামি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, বিগত ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহুল আলোচিত ও কথিত মাইনাস-২ ফর্মুলা বাস্তবায়নে আসামি বাবরসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নামে মিথ্যা কাগজপত্র সৃষ্টি করে বানোয়াট মামলা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দুই নম্বর সাক্ষী জেরাতে বলেছেন, তিনি শুনেছেন তখন সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছিলেন। তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার দলের অনেক সংসদ সদস্য গ্রেফতার হয়েছিলেন। আসামি পক্ষের (বাবর) দাবির বিরোধিতা করে দুদকের কৌঁসুলি বলেন, আসামি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে অঢেল সম্পদ অর্জন করায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, সংবিধান অমান্য করে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান কোনো কাজ করলে তার দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে না। যে কোনো সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনমতের ফসল সাংবিধানিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনি ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তার পুনরাবৃত্তি রোধ করা।

রায়ে বলা হয়েছে, এই মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ আইনানুযায়ী (দুদক আইন, ২০০৪) আসামি প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী বাবরের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাটি দায়ের হয়েছে। উন্মুক্ত বিচার পদ্ধতি অনুযায়ী বিচার হয়েছে। আসামি আদালতে উপস্থিত থেকে তার নিযুক্ত কৌঁসুলি এম আমিনুল ইসলামের মাধ্যমে জেরা করার সুযোগ পেয়েছেন। আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ দুটি অভিযোগ আনয়ন করেছে। এর মধ্যে বাড়ি নির্মাণে ২৬ লাখ ৪২ হাজার টাকার তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জনের অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে প্রাইম ব্যাংকের শাখায় একটি হিসাব নম্বরে জমাকৃত ১০ লাখ ইউএস ডলার অর্থাত্ প্রায় ৭ কোটি টাকার তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূতভাবে অর্জনের অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে দুদক। যেহেতু আসামি একজন সাবেক আইনপ্রণেতা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েও সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে সম্পদ অর্জন করায় দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তি প্রদান যুক্তিযুক্ত মনে করি। তবে অস্ত্র মামলায় বাবরের ১৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুটি ধারায় তাকে মোট আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।

এ প্রসঙ্গে বাবরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম. আমিনুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, এই মামলায় আমাদের যুক্তি ছিল বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কাগজপত্র সৃজন করে এই মামলা করা হয়েছে। সেসময় অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আদালত এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা দৃষ্টিকটু

প্রাইম ব্যাংক গুলশান শাখায় বাবরের সঞ্চয়ী হিসাবে ১০ লাখ ইউএস ডলার দুটি ডিডিমূলে জমা দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই যখন ঐ ডলার জমা দেওয়া হয় তখন বাবর ছিলেন কারাগারে। কিন্তু এর আগে ঐ বছরের ২৩ জুলাই কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দুদক সচিব বরাবর হিসাব বিবরণী দাখিল করেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের ৭ নম্বর সাক্ষী জেরাতে স্বীকার করেছেন এই মামলার ঘটনার সময় দুদকের মামলাগুলো জয়েন টাস্কফোর্স মনিটর করত। এই ১০ লাখ ডলার (প্রায় ৭ কোটি টাকা) কার, কে আসামির সঞ্চয়ী হিসাবে পাঠাল বা কোথা থেকে আসল এই বিষয়গুলোর কোনো উত্তর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা দিতে পারেননি। ফলে এই অর্থের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে তত্কালীন তদন্ত কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক রূপক সাহার অবহেলা, প্রকৃত সত্য উন্মোচনে অনীহা রীতিমতো দৃষ্টিকটু। কারণ, এই অর্থ আসামি বা তার কোনো লোক কর্তৃক জমা করার দাবি আদৌ প্রমাণিত হয়নি। এই অর্থ আসামি বিদেশে কোথায়, কোন ব্যাংকে, কোন অ্যাকাউন্টে রাখে তার কোনো তথ্য নাই এই মামলায়। ফলে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে দুদক।