‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ’—শুধু নজরুলই নন, যুগে যুগে সম্প্রীতির এই সুরে গলা মিলিয়েছেন বহু খ্যাতিমান। সাম্প্রদায়িকতা রুখে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরিতে তারা যে লড়াই করে গেছেন, এত বছর পরেও তা আমাদের এখনো অনুপ্রেরণা জোগায় এবং স্বপ্ন দেখায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে। অসাম্প্রদায়িকতা মানে জাতিভেদ ভুলে ভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি করা, এক মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও অন্য মতাদর্শের মানুষকে সম্মান করা, ভালোবাসা।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্মুখে এগিয়ে চলার শক্তি কোনো একক মানুষ থেকে আসে না। এই শক্তির মধ্যে থাকে আলাদা আলাদা সত্তা, আলাদা আলাদা সম্প্রদায়। প্রত্যেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি। কিন্তু যখন এসব সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা একে অপরের জন্য হয়ে ওঠে আত্মঘাতী। বেশির ভাগ সময় এগুলোর পেছনে মানুষের মানসিকতাই দায়ী। এর কারণে সমাজে চলতে থাকে মারামারি, খুনখারাবি, রেষারেষি।
অতি সম্প্রতি আমরা একটি অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সংঘর্ষ ছড়িয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর ফলে দেশব্যাপী সামাজিক মাধ্যমগুলোও এখন উত্তপ্ত। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের সংঘাত আমাদের চোখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো সংঘটিত হওয়ার পেছনে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস, মানুষে-মানুষে বৈষম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের অভাব এবং উগ্র মানসিকতা। কিন্তু প্রতিটি ধর্মই আমাদের মিলেমিশে থাকতে শেখায়। আমরা চাইলেই অন্য সম্প্রদায়কে আঘাত না করে বাঁচতে পারি।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নতুন কিছু নয়। আবার ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে সৌহার্দ, আন্তরিকতা ও বোঝাবুঝির দৃষ্টান্তও বহু রয়েছে। ‘পূর্ব পাকিস্তান’কে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশে রূপ দিতে আমাদের ৩০ লাখ প্রাণ ঝরাতে হয়েছে। এই যুদ্ধে আমরা জয় ছিনিয়ে এনেছিলাম ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বাঙালি জাতি হিসেবে। আজো আমরা গর্বভরে নিজেদের বাঙালি হিসেবেই পরিচয় দিই। তাহলে সেই স্বাধীন দেশের জাতি হয়ে স্বজাতির প্রতি আমরা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব কেন লালন করি? যে ধরনের মনোভাব আমাদের একসঙ্গে চলতে বাধাগ্রস্ত করে, মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে, সমাজকে পিছিয়ে দেয় বহু বছর, আমরা কেন সেই আচরণের পক্ষপাতী?
অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমরা যত দূর আগাতে চাই তা কখনোই সম্ভব হবে না যদি পারস্পরিক দাঙ্গা চলতে থাকে। একটি দেশের সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই অধিকার রয়েছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার। খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের কর্মকাণ্ডে যাতে কারো বিশ্বাসে আঘাত না লাগে। কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি আমাদের নিজেদের আরো বেশি হতে হবে অসাম্প্রদায়িক, পরোপকারী ও মানবিকতাবোধসম্পন্ন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, যশোর সরকারি সিটি কলেজ, যশোর
