তবুও স্বপ্ন সূর্য ছিনিয়ে আনার

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ২২:৩২

g  নোমান মোহাম্মদ

 

২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ-যাত্রার আগে মাশরাফি বিন মুর্তজার সংবাদ সম্মেলনটা বেশ মনে আছে।

শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের রুমটা সেদিন রীতিমতো জনাকীর্ণ। ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ অবস্থা। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। মাশরাফি উত্তর দেন। তবে তা কাঠগড়ার সওয়াল-জবাব নয় বরং ১৬ কোটি ক্রিকেট পাগলের প্রত্যাশাকে শব্দের বুননে গাঁথেন যেন অধিনায়ক। ‘বিশ্বকাপ জয় কি সম্ভব?’—এমন প্রশ্নেও ঠারেঠোরে থাকে তার হাসিমুখের অনুমোদন; প্রতিশ্রুতি মাখা প্রতিজ্ঞা।

সংবাদ সম্মেলন কক্ষে তাই স্বপ্নের রেণু আলগোছে উড়তে থাকে কার্তিকের মিহিবৃষ্টির মতো। হূদয় থেকে হূদয়ে ভেসে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ছড়িয়ে পড়তে যা সময় নেয় না।

সময়ের টাট্টু ঘোড়ায় চেপে দুই  বছর এগিয়ে আসুন এবার। এই যে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে গেল বাংলাদেশ, সেখানে কোন প্রতিশ্রুতি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের? ওহ্, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিযানের আগে অধিনায়কের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনই তো হয়নি!

আরেকটি ব্যাপারও দেখুন। দুই বছর আগের বিশ্বকাপ মিশনের আবহে প্রবলভাবে জড়িয়েছিল জার্সি-বিতর্ক। বার কয়েক বদলের পর ঠিক হয় জার্সি। সে জার্সি গায়ে ক্রিকেট বীরদের হাসিমুখের পোজ। সেখানে সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতি কি লঙ্কাকাণ্ডই না বাধিয়েছিল! এবার? জার্সি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু কথা চালাচালি হয়েছে ঠিক। কিন্তু তা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে দেয়নি। কারণ ক্রিকেটাররা দেশ ছাড়ার পর যে এই বিশ্বকাপ জার্সির উন্মোচন!

এই যে অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন হয় না, ক্রিকেটারদের উপস্থিতিতে জার্সি-পরিচয় হয় না। কেন? একেবারে নির্দিষ্ট করে তো আর বলা যায় না, তবে দুয়ে দুয়ে চার মেলানো যায় বই কি। বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা এ সময় ব্যস্ত ছিলেন বিসিবি নির্বাচন নিয়ে। জাতীয় দলের বিশ্বকাপের চেয়ে নির্বাচনের গুরুত্ব তাদের কাছে ঢের বেশি। মনোযোগটা তাই সেদিকেই। আর কর্তার ইচ্ছেয় যেমন কর্ম, তেমনি বিসিবির দায়িত্বপ্রাপ্তরা হেঁটেছেন সে পথে। নিয়মরক্ষার চেয়ে কর্তার মন রক্ষাই যে বড়!

তবে ঐ যে ক্রিকেট-উন্মাদনায় ভেসে যাওয়া ১৭ কোটি মানুষ আছেন না! তাদের কাছে বিসিবি নির্বাচনটা কেবলই নিয়মরক্ষার। আগ্রহের পুরোটা জুড়ে বরং বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান। আর প্রত্যাশা তো এখানেও কম না! চাই কী একবারে শিরোপাই!

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পিঠাপিঠি দুই সিরিজের অভূতপূর্ব সাফল্যই বাড়িয়ে দিচ্ছে স্বপ্ন দেখার সাহস।

তর্কে অস্বীকার করলেও কারোই তো চুপিচুপি মেনে নিতে দ্বিধা থাকার কথা নয় যে, সে দুই সিরিজ জয়ে ‘ফাঁকি’ ছিল। কুড়ি-বিশের সঙ্গে বেমানান উইকেটের ফাঁকি। প্রতিপক্ষের তারকা ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতির ফাঁকি। বিশ্ব আসরে সেটি ‘ফাঁস’ হয়ে যাবার আশঙ্কা তো রয়েছেই। কিন্তু এসব একপাশে সরিয়ে বিশ্বসেরা বীজও তো রোপণ হয়েছে সেখানে। টুর্নামেন্টে তা মহিরুহ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখায় দোষ কোথায়!

সে স্বপ্নে সবচেয়ে বড় দুই কান্ডারি সাকিব আল হাসান ও মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দুই পোস্টারবয়। বিশ্বকাপের আগে আগে আইপিএল খেলে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছেন যারা। মুস্তাফিজ তো নিজেকে ফিরে পেয়েছেন যেন। কাটারে; স্লোয়ারে; রহস্যময় তার জাদুতে। তাকে সামলাতে খাবি খেয়েছে তুখোড় ব্যাটসম্যানরাও। সর্বশেষ বিশ্বকাপ, মানে ২০১৯ ওয়ানডে আসরেও খারাপ করেননি। শেষ দুই ম্যাচে ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে তো পাঁচ দু গুণে দশ উইকেট নিয়েছেন। টুর্নামেন্টে ২০ শিকার। তারপরও নিজের সেরাতে ছিলেন না কিছুতেই।

এবার জাতীয় দলের জার্সিতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিধ্বংসী; আইপিএলে বিস্ফোরক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাই অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ খুব করে তাকিয়ে থাকবেন মুস্তাফিজের দিকে।

আর সাকিব? তার সম্পর্কে বলতে গেলে তো শব্দের ভাঁড়ারে টান পড়ার জোগাড়। আইপিএলে সেভাবে খেলার সুযোগ পাননি বলে দুশ্চিন্তা? সেটা তো ২০১৯ বিশ্বকাপের আগেও পাননি। এরপর সেখানে সাকিবের পারফরম্যান্সের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে! ৬০৬ রান এবং ১১ উইকেট।

আরেক বিশ্বকাপের আগে আইপিএলে সেভাবে খেলার সুযোগ না পাওয়া কি তাতিয়ে দেবে না সাকিবকে? তাহলে ঐ আগুন প্রতিপক্ষকে পোড়াবে; বাংলাদেশকে পথ দেখাবে।

স্কটল্যান্ড, ওমান, পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে প্রথম পর্ব উতরে যাওয়ার কথা সহজে। সুপার টুয়েলভ থেকে সেমিফাইনালে ওঠার পথটা অবশ্য কাঁটা বিছানো। সেটিকে ফুলের সৌরভে বদলে দিতে পারবেন আমাদের ক্রিকেটাররা? সাকিব-মুস্তাফিজ না হয় ট্রাম্পকার্ড। আছেন তো আরো অনেকে। মুশফিক থেকে লিটন, মাহমুদউল্লাহ থেকে আফিফ, তাসকিন থেকে নাসুম। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু থেকে আরো উঁচুতে তুলে ধরার সামর্থ্য নিশ্চয়ই রয়েছে তাদের।

যদি তা পারেন, তাহলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে প্রত্যাবর্তনটা সাড়ম্বরেই হবে বাংলাদেশের। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো নয়। দুই বছর আগে-পরে বাংলাদেশের দুই বিশ্বকাপ-যাত্রা দুইরকম। ফেরাটাও না হয় আলাদা হোক। দুই বছর আগের মতো ব্যর্থতার গ্লানিতে নয়; এবার সাফল্যের সূর্যটা ছিনিয়ে ফিরুক এ মানচিত্রে।

পারবেন ক্রিকেটাররা? পারবেন না ক্রিকেটাররা?

 

লেখক : সম্পাদক, নট আউট নোমান