বিশ্ব জুড়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট কাভার করতে গিয়ে অনেক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা হয়েছে। সম্ভবত সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে শেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারলন স্যামুয়েলসের সেই সংবাদ সম্মেলনের দৃশ্য। ইডেন গার্ডেনসে শেষ ওভারে কার্লোস ব্রাথওয়েটের চার-ছক্কায় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাঠ জুড়ে পাগলপারা উল্লাস-আনন্দে ভাসছে। ৬৬ বলে অপরাজিত ৮৫ রান করা মারলন স্যামুয়েলস ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এলেন। গল্পের শুরু সেখান থেকে। বছর পাঁচেক আগে কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে সেই বিশ্বকাপ ফাইনাল কাভার করা এম এম কায়সার সেই গল্পই শোনাচ্ছেন নতুন আঙ্গিকে—
এ কটু দেরি করে যারা সংবাদ সম্মেলনকক্ষে এলেন, তারা অবাক! এ কী বাবা! এই অবস্থা কেন? ও এভাবে বসে কেন? এত লোকের সামনে এভাবে কেউ বসে? তাছাড়া টিভিতে এটা কেমন দেখাবে? ভব্যতা-সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে যে!
এমন একগাদা নীরব প্রশ্ন ও কৌতূহল উড়ল মারলন স্যামুয়েলসের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে চেয়ারে বসার স্টাইল নিয়ে! চেয়ারে তিনি ঠিকই হেলান দিয়ে বসলেন। আসলে বসা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। বলা উচিত চেয়ারে প্রায় শুয়ে ছিলেন! পা দুটো সামনের টেবিলের ওপর আড়াআড়ি করে রাখা। প্যাড জোড়া তখনো খোলেননি। সংবাদ সম্মেলনের পুরোটা সময় এভাবেই টেবিলের ওপর পা তুলে বসে সময়টা কাটালেন। সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন।
আর হ্যাঁ, শেন ওয়ার্নকে একটা বিশাল ছক্কা হাঁকালেন! ফেললেন ইডেনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গায়!
—কীভাবে?
সেই ব্যাখ্যায় পরে আসছি।
তার আগে থাকি ফাইনাল শেষে মারলন স্যামুয়েলস ও ড্যারেন স্যামির ‘বিশ্বজয়ের’ কথায়।
কার্লোস ব্রাথওয়েটের তৃতীয় ছক্কাটা হতেই মাঠে উল্লাসে ফেটে পড়েন স্যামুয়েলস। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডাগআউটে তখন একটাই সুর, একটাই গান—‘চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন!’
ম্যাচ জিতে মাঠে লম্বা সময় নাচ-গান শেষে সংবাদ সম্মেলনে সবার আগে এলেন স্যামুয়েলস। চেয়ারে বসার পর প্রথমেই অনুমতি নিলেন, ‘তোমরা যদি কিছু মনে না করো, তবে আমি আজ এখানে একটু আরাম করে বসতে চাই।’
সমস্বরে অনুমতি মিলল।
প্রায় ২০ ওভার কলকাতার এপ্রিলের গরমে ব্যাটিং করে এতক্ষণ দৌড়ানোর পর পা দুটিকে খানিকটা বিশ্রাম দিতেই টেবিলের ওপর সটান করে রাখলেন স্যামুয়েলস। পা গুটিয়ে বসলে হয়তো হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়তে পারে, তাই এই বাড়তি সতর্কতা।
সম্ভবত তাই টেবিলের ওপর পা তুলে বসায় স্যামুয়েলসের এ স্টাইলে কেউ অভদ্রতা বা ব্যাড ম্যানারিজমের গন্ধ খুঁজলেন না।
বরং পুরোটা জুড়ে যা মিলল তার নাম—খোলা আকাশ! আনন্দ-উচ্ছাস-উত্সবের ছটায় নিজেকে খোলামেলাভাবে প্রকাশের খেয়াল। প্রকাশের এমন সারল্য ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের মতো আর কে কখন কোথায় করতে পারে?
২০১৬ সালের ৩ এপ্রিলের টি-টোয়েন্টির ফাইনাল শেষে ইডেনের প্রেসবক্স তারই সাক্ষী হয়ে রইল! শেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে আসার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে একটা দল, এই দলটাও যে বিশ্বকাপ জিততে পারে; জেতার ক্ষমতা রাখে, অন্তত সেটুকুও যে অনেক ক্রিকেট পণ্ডিত মানতে চাননি।
ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত ক্রিকেট বিশ্লেষক মার্ক নিকোলাস তো বলেই বসেন, “এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ‘কম মস্তিষ্কের’ দল।” শক্তিমত্তা-সম্ভাবনার প্রসঙ্গ এলেই টুর্নামেন্ট-পূর্ব আলোচনায় বিশ্লেষণে ক্যারিবীয়দের ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেয় প্রায় সবাই। এই দলের প্রতিটি পদক্ষেপেই নেতিবাচক শব্দমালা খুঁজে ফেরা হতো।
এমনকি বলাও হলো, ‘দুর...এরা এত আমুদে, এরা কী ক্রিকেট খেলবে!’
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, সবার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি; এমনকি স্বয়ং নিজ ক্রিকেট বোর্ডেরও! ফাইনালের ট্রফি হাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক স্যামি অবাক করা তথ্য দিলেন, ‘এখানে খেলতে আসার আগে আমাদের তো খেলার জার্সিও ছিল না! বোর্ড তো খোঁজ-খবরই নেয়নি। ভাগ্য ভালো যে, নতুন ম্যানেজার পেয়েছিলাম টুর্নামেন্টে। সে-ই সব গুছিয়েছে পরে।’
বাকিটা বিশ্বের চরম অবহেলা। উদাসীনতা। ওদের দিয়ে কিছু হবে না—এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে দাঁতে দাঁত চেপে স্যামির দল প্রতিজ্ঞা নেয়, ‘নাহ, এবার সত্যিই বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে হবে। আমরা যে কী পারি সেটা জানাতে হবে।’
বুক জুড়ে জমতে থাকা একরাশ পুঞ্জীভূত কষ্ট ও রাগ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মতো টগবগ করে ফোটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পুরো ১৫ জনের মধ্যে।
তবে মুখে নয়, জবাবটা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো ক্ষেত্র হবে মাঠ। বল ও ব্যাট হাতে বাকি সবাইকে সেই জবাবটা দিতে হবে—টুর্নামেন্টের প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের আগে। প্রতিটি হার্ডলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দল সেই শপথ নিয়েই খেলতে নামে।
—ফল?
ইংল্যান্ডকে গ্রুপের প্রথম ম্যাচেই উড়িয়ে দিল। জিতল ৬ উইকেটে। ক্রিস গেইল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আগমনী বার্তার জানান দিলেন।
এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের শিকার শ্রীলঙ্কা। ব্যাঙ্গালোরের লো স্কোরের ম্যাচ ক্যারিবীয়রা জিতল ৭ উইকেটে। ওপেনার আন্দ্রে ফ্লেচার ৬ বাউন্ডারি ও ৫ ছক্কায় হার না মানা ৮৪ রানে ম্যাচ-সেরা।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে নাগপরের লো স্কোরের নাটকীয় ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হারাল তিন উইকেটে, ম্যাচের দুই বল বাকি থাকতে। ম্যাচে ক্যারিবীয়দের নায়ক মারলন স্যামুয়েলস।
আফগানিস্তানের কাছে নাগপুরে পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে যায় ৬ রানে। তবে সেই হারের আগেই যে তাদের সেমিফাইনাল নিশ্চিত।
ভারতকে সেমিতে ৭ উইকেটে হারাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাতেই বদলে গেল বিশ্বকাপের হিসাব। মুম্বাইয়ে ভারতের ১৯২ রান যে ব্যাটিং শক্তিমত্তা দিয়ে অনায়াস ভঙ্গিতে ক্যারিবীয়রা টপকে গেল; মূলত সেদিনই লেখা হয়ে গিয়েছিল ২০১৬-এর বিশ্বকাপ ট্রফি কার হাতে উঠছে। সেমির আগে দলের সঙ্গে হঠাত্ যোগ দেওয়া লেন্ডল সিমন্স নায়ক হয়ে গেলেন।
ইংল্যান্ড ইডেনের ফাইনালের শেষ ওভার পর্যন্ত জয়ের কাছাকাছিই ছিল। ছয় বলে ১৯ রান তো সহজ টার্গেট নয়। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ জানাল, তাদের কাছে তাদের দিনে সবকিছুই ‘দুধভাত’। শেষ ওভারে টানা চার বলে ৪ ছক্কায় ফাইনাল শেষ!
—কে করলেন কাজটা?
কার্লোস ব্রাথওয়েট। মূলত বোলার। তবে তাকে টি-টোয়েন্টি বিশ্ব মনে রাখবে চার-ছক্কার ব্যাটসম্যান হিসেবেই! টি-টোয়েন্টিতে দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা প্রমাণ করার জেদ, জোশ, ক্ষোভ, রাগ—সবকিছুই যে ইডেনের সেই আলো ভরা রাতে একাই জিতল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
স্যামির হাতে ধরা ঐ বিশ্বকাপ থেকে আসা রুপালি আলোর বিচ্ছুরণ সেই সংকেতই দিল।
আর হ্যাঁ, মারলন স্যামুয়েলস বনাম শেন ওয়ার্নের সেই গল্প।
সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া সফর থেকেই সমস্যাটা চলে আসছে। কেন জানি স্যামুয়েলসকে পছন্দই করেন না ওয়ার্ন। ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানের যোগ্যতায় বোধ করি ওয়ার্নের সংশয় ছিল তাই। এই ‘জটিলতায়’ স্যামুয়েলস নিজেও অবাক, ‘আমি জানি না কেন সে আমাকে দেখতেই পারে না। সম্ভবত আমার চেহারাটাই সত্যি। ওয়ার্নেরটা নয়!’
ইডেনের ফাইনালে ম্যাচ-সেরার ট্রফিটা উঁচিয়ে স্যামুয়েলস বলেও দিলেন, ‘ওয়ার্ন...এটা তোমার জন্য!’
উত্সর্গ নয়; জবাব!
আসলে ঔদ্ধত্যের মধ্যেও যে সৌন্দর্য আছে, সেটা শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজকেই মানায়। চার-ছক্কার মারকাটারি টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংও যেন সেই সৌন্দর্যের প্রতিভূ! বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আনন্দে অবগাহন এবং সংবাদ সম্মেলনে মারলন স্যামুয়েলসের দুই পা টেবিলে তুলে আধশোয়া ভঙ্গি আরেকবার জানিয়ে দিল—এমন উদ্দাম ক্রিকেট শুধু তাদেরই মানায়, তারাই শানায়!
লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, রাইজিংবিডিডটকম
