বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি তরুণদের জয়জয়কার

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৯

 

বড় হয়ে কী হতে চাও? স্কুলজীবনে কারোর এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকেই হয়তো উত্তর দিতেন ডাক্তার হব, কেউ বলতেন ইঞ্জিনিয়ার হব। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট, পেশা হিসেবে পরিচিত ছিল এই কয়েকটা নাম। আবার অনেকেই বলতেন পাইলট হব, প্লেন চালিয়ে উঁচু আকাশে পাখির মতো ডানা মেলে ছুটে  যাব এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। শেষপর্যন্ত পাইলট হবার স্বপ্ন কজনের বেলায় পূরণ হয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে বিমান চালিয়ে আকাশে উড়তে হয়নি, কম্পিউটার যন্ত্র নিয়ে কাজ করে প্রযুক্তিবিদ হয়েই একদল তরুণ ছুঁয়েছেন অনন্য উচ্চতা। দেশের নাম ছড়িয়ে দিয়েছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।

অনন্য সাফল্যের গল্পগুলো জানার আগে একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। আজ থেকে দশবছর আগেও তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়গুলো মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত ছিল না। কম্পিউটার নামক যন্ত্রটি অনেকের কাছেই অরাধ্য বস্তু ছিল। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করাও যে কারোর পেশা হতে পারে, সেসময় এমন ধারণা ছিল না বেশিরভাগ মানুষের। সময় বদলেছে, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে এটিকে কাজে  লাগিয়ে তৈরি হয়েছে উপার্জনের সুযোগ। যেমন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথাই ধরা যাক। দেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হবার পর অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে পারেন। ঘরে বসে অনলাইনে আয় করার নানা সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছিল তখন থেকেই। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দেয়, হোক সেটা একটা গ্রাফিক ডিজাইন, ডাটা এন্ট্রি বা কোনো বিষয়ে লেখালেখির কাজ। বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানও ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে কাজ করাত, বিনিময়ে মিলত অর্থ। দেশে যখন তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে থাকা তরুণেরা প্রথমপ্রথম ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন, সেসময় কাজের তাগিদে বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছিল বৈকি; কিন্তু তখনও কেউ ভাবেননি যে প্রযুক্তিতে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে একদিন সরাসরি কাজের সুযোগ মিলবে!

সার্চ ইঞ্জিন গুগল, টেক জায়ান্ট অ্যাপল, মাইক্রোসফট, ইন্টেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়েবসাইট ফেসবুক, মার্কেটপ্লেস আলিবাবা, ইবে, আমাজন—এই নামগুলো কমবেশি সবার কাছেই পরিচিত। বিশাল কর্মীবহর তাদের। শুধু প্রকৌশলীই নয়, নিত্যনতুন পণ্যের ডিজাইনার, প্রোডাক্ট ম্যানেজার, কর্মপরিকল্পনা সাজানোর স্ট্র্যাটেজি অফিসারসহ বিভিন্ন পদে লোকজন কাজ করেন এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে। আনন্দের ও গর্বের বিষয় হলো, একদল বাংলাদেশি তরুণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নেতৃত্বে দিচ্ছেন। এই তালিকায় ফেসবুক থেকে শুরু করে ইন্টেলের মতো প্রতিষ্ঠানও যোগ হয়েছে। কাজের পাশাপাশি তারা এও স্বপ্ন দেখছেন যে, তাদের হাত ধরে একদিন বাংলাদেশেই গড়ে উঠবে বিশ্বমানের প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

যেহেতু প্রযুক্তির বিষয়, তাই প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের কথাই সবার আগে আসে। তবে শুধু কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরাই যে এগিয়ে আছেন তা নয়। ব্যবসা প্রশাসন, জনশক্তি ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করা অনেক তরুণ উচ্চপদে উচ্চবেতনে চাকরি করছেন। বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন তরুণ পেয়েছেন গুগলে চাকরির সুযোগ। প্রথমদিকে এধরনের সুযোগ পাওয়াকে আকাশ কুসুম কল্পনার মতো মনে হলেও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শুরু থেকেই অনেক তরুণের লক্ষ্য থাকে গুগলে চাকরি করার। ভাবনার পরিধিও প্রসারিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী গুগলে কর্মরত আছেন। দেশেরই এক তরুণ উচ্চপদে চাকরি করেছেন চীনাভিত্তিক ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা ডটকমে। তার মাধ্যমে দেশে বসে কাজের সুযোগ পেয়েছে আরও অনেক তরুণ। ফেসবুকে সফটওয়ার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন বুয়েট থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলে পড়াশোনা করা এক তরুণ। তার দায়িত্ব মেসেজিংয়ের নানা খুঁটিনাটি দিক নিয়ে কাজ করা। কম্পিউটারের সবচেয়ে জটিল যন্ত্রাংশ প্রসেসর ও মাদারবোর্ডের জন্য জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ইন্টেলে কাজ করছেন আরেক মেধাবী তরুণ, যার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিষয় ছিল প্রসেসরের কর্মক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে। বাদ যাচ্ছে না ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীরাও। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা করা বেশ কয়েকজন তরুণ বিশ্বখ্যাত এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে চাকরি করছেন। জানা গেছে, বাংলাদেশিদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে বেশ বড়সংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছেন। মাত্র অল্পকিছু গল্পই জেনেছি আমরা। আরও অসংখ্য সফল তরুণের কথা না জানাই রয়ে গেছে। তা সে যাই হোক, এই সাফল্যের পেছনে তাদের যোগ্যতা ও মেধা নিশ্চয়ই ছিল, ছিল প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি, চোখে ছিল স্বপ্ন। আর লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম ও একাগ্রতাই তাদেরকে নিয়ে গেছে সাফল্যের পথে। এই তরুণেরা এখন লাখো তরুণের অনুপ্রেরণার উত্স।  

বাংলাদেশের তরুণেরা এখন আর আগের মতো চিন্তা করেন না, ‘বড় হয়ে ডাক্তার হব কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হব’। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার কথা ভাবলেও তাতে যোগ হয়েছে  বাড়তি মাত্রা। এখন স্বপ্ন গত্বাঁধা গণ্ডিকে ছাপিয়ে  ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমায় আব" না হয় এই তরুণেরা পুরো বিশ্বের কাছে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের নাম।

আসিফ খান চৌধুরী

মাইক্রোসফট

 

কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম মাইক্রোসফট উইন্ডোজের জন্যই মাইক্রোসফট বহুল পরিচিত। আর এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের নাম তো সবারই জানা। বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসিফ খান চৌধুরী। শৈশবে তার মনে বাসা বেঁধেছিল পাইলট হওয়ার স্বপ্ন। বিস্তৃত নীল আকাশের বুকে ছোট্ট একটি যান্ত্রিক পাখি নিয়ে উড়ার আকাঙ্ক্ষায় বিভোর হয়ে কেটেছে তার পুরোটা শৈশব। কিন্তু এরপরে হঠাত্ একদিন তার পরিচয় ঘটল কম্পিউটারের সঙ্গে। ছোট্ট এই জাদুর বাক্স কেড়ে নেয় তার মনোযোগ ও আগ্রহ। তখন থেকেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। আর সেই স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি পৌঁছে গেছেন মাইক্রোসফটের দ্বারপ্রান্তে! আসিফ খান চৌধুরীর স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে সাতক্ষীরায়। এরপর রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় তার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। স্কুলজীবন থেকেই ম্যাথ অলিম্পিয়াডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন আসিফ। প্রবলেম সলভিং শুরু করেন ২০১১ সালে। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রবলেম সলভিংকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি, তেমনি সমানতালে অংশগ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায়। এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আসিফের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছিল নানা ধরনের অভিজ্ঞতা। আসিফের জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো সেলিস রকিং সফটওয়্যার কর্তৃক আয়োজিত ‘সুপার ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চাকরি মেলায় আসিফকে জুনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরির জন্য প্রস্তাব দেয় সেলিস রকিং সফটওয়্যার। তিনি তখনো ফাইনাল পরীক্ষা দেননি। পরবর্তীতে ফাইনাল পরীক্ষার পাট চুকিয়ে আসিফ যোগ দেন সেলিসে। এক বছর সাত মাস সেলিসে কাজ করার পর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসিফ পাড়ি জমান সুইডেনে। যোগদান করেন এডফেনিক্স এবিতে। সেখান থেকে পরবর্তীতে যোগদান করেন ন্যাসডাকে। ন্যাসডাকে যোগদানের পরপরই মাইক্রোসফট থেকে কল পান আসিফ। দিনটি ছিল ১ মার্চ, ২০১৮। মাইক্রোসফটের একজন ডেভেলপার আসিফকে কল দিয়ে জানান যে তারা আসিফের একটি সাক্ষাত্কার নিতে চান। অতঃপর ২১ মার্চ কোপেনহেগেনে আসিফের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করা হয়। আসিফ বলেন, পুরো সাক্ষাত্কারে কেউই আমাকে আমার সিজিপিএ কত, তা জিজ্ঞাসা করেননি। তারা যা দেখেছেন, তা হলো আমার দক্ষতা ও সক্ষমতা। এরপর ২৩ মার্চ মাইক্রোসফট থেকে তাকে চাকরির ব্যাপারে নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পড়াশোনা সম্পর্কে তরুণদের উদ্দেশে আসিফ বলেন, ‘শুধু পড়াশোনার মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখা যাবে না। পড়াশোনার পাশাপাশি পছন্দের ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা অর্জনের দিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তার আশা, এই তরুণ সমাজ পুরো বিশ্বে সৃজনশীলতা ও ভালো কাজ দিয়ে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে বাংলাদেশের নাম।

সউদ ফারহান চৌধুরী

ইন্টেল করপোরেশন

 

কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের সবাই কম্পিউটারের মস্তিষ্ক বা সিপিইউ নামটির সাথে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান সিপিইউয়ের যন্ত্রাংশ তৈরি করলেও ‘ইন্টেল’ সবার কাছে এক নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রাংশের ব্যবহারকারীই সর্বাধিক। ইন্টেলে কর্মরত অসংখ্য প্রকৌশলী ও কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের ৭০ জন। এই ৭০ জনের মধ্যে রয়েছেন সউদ ফারহান দীপ নামের এক তরুণ প্রকৌশলী। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক এই ছাত্র ২০১৬ সাল থেকে কর্মরত আছে ইন্টেল করপোরেশনে।

সুনামগঞ্জ শহরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ও মুনমুন চৌধুরী একমাত্র ছেলে দীপ। বাবা-মা ও এক বোনকে নিয়ে চারজনের ছোট্ট পরিবার। কুমিল্লার ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি পাস করার পর ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে ২০০৫-এ এইচএসসি পাস করেন। বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেন ২০১১-তে। বরাবরই মেধাবী দীপের ফলাফল ছিল অসাধারণ। স্নাতক শেষ করে একটা সফটওয়্যার ফার্মে কিছুদিন চাকরি করেন। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের  ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন তাকে পিএইচডি করার জন্য বৃত্তি দেয়। এই বৃত্তির আওতায়  তিনি ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটে ভর্তি হন। ২০১৬ সালে ৪.০০ গ্রেড পয়েন্টের স্কেলে ৩.৯৬ পেয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। গবেষণার বিষয় ছিল ল্যাপটপের ভেতরে থাকা মাইক্রোপ্রসেসরে কর্মক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে। বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় তার কাছ থেকে সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তাই নিজের থিসিস উত্সর্গ করেন একাত্তরের শহীদদেরকে। পিএইচডি করার পর ইন্টেলে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ আসে। পরে মেধা ও ফলাফল দেখে ইন্টেল তাকে চাকরির অফার দেয়। এরপর থেকে তিনি সেখানে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

দীপ বলেন, বাংলাদেশে কম্পিউটার নির্ভর অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা। প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও ইন্টেলের শাখা স্থাপিত হবে, এমনটাই ভাবনা তার।

সৈয়দ তানভীর মোনাওয়ার

আমাজন

 

ছোটবেলা থেকে তানভীরের স্বপ্ন ছিল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবার। নিজে যখন স্কুলে পড়েছেন তখনও কম্পিউটার দেখা যেতনা বললেই চলে। প্রথম কম্পিউটারের স্পর্শ পান বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সুনামগঞ্জের ছেলে সৈয়দ তানভীর মোনাওয়ার ২০১৬ সালে যোগ দিয়েছেন বিশ্বখ্যাত অনলাইন মার্কেটপ্লেস আমাজনে। কর্মস্থলে তার পদবি সিনিয়র প্রোডাক্ট ম্যানেজার। ধাপে ধাপে যোগ্যতা ও মেধার পরীক্ষা দিয়ে এসেছেন এ পর্যন্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সমৃদ্ধ করেছেন অভিজ্ঞতার ঝুলি। তানভীর তার বাবা সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী ও মা সারাহ মোনাওয়ারের চার ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় মেধাবী ছিলেন। ১৯৯৩ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে স্টার মার্কস, ১৯৯৫ সালে ইস্পাহানি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে কুমিল্লা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। তবে পড়াশোনা ছাড়াও তিনি কবিতা লিখতেন, গান শুনতেন ও গল্পের বইয়ে ডুবে থাকতে ভালোবাসতেন। এখনো সেই অভ্যাস অব্যাহত আছে বলে জানা গেল। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তানভীর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে। কিন্তু কম্পিউটারে প্রকৌশলী হবার সেই ইচ্ছাটা তাকে তাড়িত করছিল। পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি দেখা দেয় উদাসীনতা। শেষমেশ একবছর পর পুরোনো ইচ্ছাতেই ফিরে যান, কম্পিউটার সায়েন্সে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কম্পিউটারের জগতেই ব্যস্ত থেকেছেন। স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি হয়, পরে তাদের মাধ্যমে পাড়ি জমান জাপানে। সেখানে কাজ করতে করতে নিজের যোগ্যতাকে ঝালাই করেছেন। চাকরির পাশাপাশি এমবিএ করেছেন যুক্তরাজ্যের লিচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। মূলত এর পরপরই ব্যাংকিং ও ম্যানেজমেন্ট সেক্টরে কাজ করা ঝোঁক তৈরি হয়। প্রথাগত সফটওয়ার প্রকৌশলীদের মতো প্রোগ্রামিং বা কোডিং থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। মাঝে চাকরিবদল করে জাপানের শীর্ষস্থানীয় কিছু প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেন ব্যাংকিং আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আমাজনে যোগ দেওয়ার আগে সর্বশেষ কাজ করেছেন জাপানের টেক জায়ান্ট রাকুটেনে, বিশ্বের বহুল ব্যবহূত ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জার ‘ভাইবার’ এই প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাধীন। সফটওয়্যার প্রকৌশলী হলেও বেশিরভাগ সময়ই কাজ করেছেন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে। এই বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য নিজের লেখা একটি বই প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্লগে প্রায়শই গল্প-কবিতা লিখেন। তানভীরের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা হলো আমাজনের সঙ্গেই থাকতে চান। এ ছাড়া দেশে নিজের এলাকায় এলিমেন্টারি স্কুল খোলার স্বপ্ন দেখেন। তানভীরের ভাষায়, সব শিক্ষাকে পূর্ণতা দেয় নৈতিক শিক্ষা। সেই শিক্ষা না থাকলে সবই বৃথা।

মেহেদী বখত

ফেসবুক

 

প্রায় সবার দৈনন্দিন জীবনে জড়িয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। আর কর্মজীবনে ফেসবুককে জড়িয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশি এক তরুণ সফটওয়্যার প্রকৌশলী মেহেদি বখত। ফেসবুকের মেসেজিং টিমে কাজ করছেন তিনি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেখানে ২০১২ সালে ফেসবুকে যোগদান করেন। বর্তমানে মেহেদী বখতসহ পাঁচ বাংলাদেশি ফেসবুকে কর্মরত আছেন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে এসএসসি ও ১৯৯৮ সালে এইচএসসি শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন মেহেদী। দু’বারই সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান অর্জন করেন। স্নাতক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা-ক্যাম্পিংয়ে (ইউআইইউসি) পড়তে যান। এখান থেকেই নেটওয়ার্কিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সালে ফেসবুকে চাকরি পান।

প্রযুক্তিতে বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠানই দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে নিজেরাই মেধাবী তরুণদেরকে চাকরির প্রস্তাব দেয়। চলে কর্মী অনুসন্ান কর্মসূচি। এভাবে ফেসবুকই মেহেদী বখতকে খুঁজে নিয়েছিল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়ার সময় দুইবার এসিএম আন্তর্জাতিক কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার (আইসিপিসি) চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এসব কারণে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজা শুরু করেন। ফেসবুকে সরাসরি ইন্টারভিউ দেন। পরে তাকে নির্বাচিত করে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ থেকে কীভাবে ফেসবুকে কাজের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে, সে ব্যাপারে তিনি বলেন একাগ্রতা নিয়ে লেগে থাকতে হবে। অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফেসবুকের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান নিজেদের অফিসকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যাতে কর্মরতদের সবাই প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনে করে। সাধারণ বা প্রথাগত অফিসের মতো নয় সেখানকার পরিবেশ।

ভবিষ্যতে দেশের প্রযুক্তি খাতে উদ্যোগ শুরু করতে চান মেহেদী বখত। তিনি বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এখন উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্বসেরা সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ। নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

মেহেদী রেজা

আলিবাবা

 

ছোটবেলায় খেলাধুলার প্রতিই বেশি ঝোঁক ছিল মেহেদীর। আবার একসময় ভেবেছিলেন পাইলট হবেন, কিন্তু বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করায় সেই স্বপ্নের পথে আর হাঁটা হলো না। তবে বাণিজ্যে পড়াশোনা করেও দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অঙ্গনের অন্যতম পরিচিতমুখ হয়ে উঠেছেন মেহেদী। দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে কাজ করেছেন চীনের বিখ্যাত মার্কেটপ্লেস আলিবাবা গ্রুপের প্রোডাক্ট অপারেশন ম্যানেজার পদে।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন মেহেদী রেজা। দেশে ফেরেন ২০০২ সালে। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় তারা চাইতেন ছেলে যেন দেশে থেকেই কিছু করে। বছরখানেক পর মেহেদী ওয়েব ডেভলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওয়েবসাইট তৈরি, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্ল্যাশ টু-ডি অ্যানিমেশনের কাজ করতেন। বাণিজ্যের ছাত্র হওয়ায় এসব বিষয়ে একাডেমিক পড়াশোনা না থাকলেও শখের বশে শিখতে থাকেন। সেসময় প্রশিকায় কাজ করছিলেন। সেখানে  কাজ করতে করতে বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা আয়ত্ত করেন। পাঁচবছর প্রশিকায় কাজ করার পর ২০০৮ সালে জাপানে চলে যান এপ্রিওরি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে। তাদের ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেক প্রতিষ্ঠানে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। ২০০৯ সালে উন্ডেরমান নামের বিশ্বমানের একটি ডিজিটাল এজেন্সিতে কাজের সুযোগ পান। দায়িত্ব পান বাংলাদেশে উন্ডেরমানের কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার। মাঝে বেশকিছু বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেন। চারবছর উন্ডেরমানে কাজ করে ২০১৩ সালে ইমপ্রেস গ্রুপের সঙ্গে ‘আইডিজিটাল’ নামে একটি ডিজিটাল এজেন্সি শুরু করেন। বৈশ্বিকভাবে নোকিয়া, হুন্দাই ও পারটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক হয়। মাঝে কাজ করেন ‘প্রথম আলো’র সঙ্গে।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে সুযোগ পান আলিবাবা গ্রুপের সঙ্গে কাজের। আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার ইউসি ব্রাউজারের প্রচার বাড়ানো ও ব্যবহারকারীদের কাছে পছন্দসই করে তোলার জন্য কাজ করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর রাসেল। রাসেলকে ইউসি ব্রাউজারের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে মেহেদী রেজা আলিবাবা গ্রুপের সাথে সম্পৃক্ত নন। জোবাইক নামে একটি বাইসাইকেল শেয়ারিং কনসেপ্ট নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেছেন। প্রাথমিক সফলতা মিলেছে। মেহেদীর কথায়, অনেক কিছু করার আছে। নিজের যোগ্যতাকে যাচাই করতে হবে, ঝালাই করতে হবে।

রিহাত জামান নিলয়

গুগল

ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি ঝোঁক ছিল রিহাত জামান নিলয়ের। বন্ধু-বান্ধবদের কম্পিউটার বিষয়ক কোনো সমস্যা হলেই তারা ছুটে আসতেন তার কাছে। বন্ধুরা ভাবতেন সেই নিলয় একদিন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে। নিলয়ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সত্যি হয়েছে তার স্বপ্ন। সার্চ ইঞ্জিন গুগলে চাকরি পেয়েছেন রিহাত জামান নিলয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪১তম আবর্তনের ছাত্র নিলয় স্কুলের ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় থেকেই ভাবতেন কম্পিউটার নামক যন্ত্রটাকে জয় করবেন। তখন থেকেই ভাবতেন প্রকৌশলে পড়াশোনা করবেন। সে যাত্রায় সফল হন।

অবশেষে গত ২৩ আগস্ট গুগলের চাকরির চিঠি আসে তার কাছে। অতিসম্প্র্রতিই তার সেখানে যোগদান করার কথা।

মা-বাবার একমাত্র সন্তান নিলয় বেড়ে  উঠেছেন যশোরে। খেলাধুলা পছন্দ করতেন, তবে পড়াশোনায়ও ছিলেন যথেষ্ট মনোযোগী। যশোর বোর্ডে ২০০৯ সালে এসএসসি ও ২০১১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। এরপর বুয়েটে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সেখানে সহায় ছিল না, পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। গেল বছরের মার্চে স্নাতক শেষ করার পর স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শুরু থেকেই তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন পুরস্কার যোগ হয়েছে ঝুলিতে। এটিই তাকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। নিলয় বলেন, বিদেশের মাটিতে বসে শুধু গুগলের চাকরি নয়, দেশের জন্যও কিছু করতে চান তিনি। সেখান যা শিখবেন তা কাজে লাগিয়ে দেশের প্রযুক্তিখাতে কাজ করবেন। কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীদেরকে প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে, সৃজনশীল কাজ করতে হবে বলে মত দেন তিনি।

উল্লেখ্য, এর আগেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুই ছাত্র গুগলে চাকরি পেয়েছেন। একই বিভাগের সাবেক ছাত্র আরিফুজ্জামান আরিফ অনিন্দ্য মজুমদার গুগলে কাজ করছেন। নিজের বিভাগের এই সাফল্যেও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন রিহাত জামান নিলয়।