সকলের নিরাপত্তা দিতে না পারিলে কীসের শাসন?

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩১

দেশে বিভিন্ন ধর্মের উত্সব-পার্বণ ও পূজার্চনা শত শত বত্সর ধরিয়া হইয়া আসিতেছে। এই সমস্ত উত্সব-পার্বণ তো নূতন কিছু নহে। অথচ গত কয়েক দিনে দেশের বেশ কিছু স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে যেই আক্রমণের ঘটনা ঘটিল, তাহা শুধু দুঃখজনকই নহে, অত্যন্ত লজ্জার। ঘটনা ঘটিবার পরে যদি বলা হয়, ইহা সহ্য করা হইবে না—সেই কথার কি কোনো মানে থাকে? এই দেশ তো সকল ধর্মের নাগরিকের। সকলের নিরাপত্তা দিতে না পারিলে কীসের শাসন? কীসের কঠোর ব্যবস্থা? আমরা আরো একটি বিষয় লক্ষ করিয়াছি, কোথাও কোনো ঝামেলা হইলে সকল দায় পড়ে রাজনীতিবিদদের উপর। সকল কিছুর দায় যদি রাজনীতিবিদদের হয়, তাহা হইলে প্রশাসন আছে কী করিতে? আমলাতন্ত্রের কাজটা কী? অথচ জনগণের ট্যাক্সের টাকা সবচাইতে অধিক ব্যয় করা হয় সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্যই। অবস্থা দেখিয়া মনে হয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের অবস্থা ‘ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার’। বাংলাদেশে এক হাজারের অধিক মানুষের বিপরীতে মাত্র এক জন পুলিশ সদস্য কাজ করিতেছেন। বর্তমানে এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ২ লক্ষ। ইহার বিপরীতে যানবাহন রহিয়াছে হাজার দশেক। ইহার মধ্যে ৫ হাজার গাড়িই পুরাতন। দেখা গিয়াছে, মেট্রোপলিটন এলাকাগুলির চাহিদা মিটাইতে গিয়া জেলা শহরগুলিতে দিনদিন পুলিশের জনবল ও যানবাহনসংকট চরম আকার ধারণ করিয়াছে। এই জন্য জেলা পর্যায়ে কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী বা পরিকল্পিতভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করিলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে তাহা নিয়ন্ত্রণ করা ভীষণ দুরূহ হইয়া পড়ে। উপজেলা পর্যায়ে যেই সামান্য দুই-একটা যানবাহন আছে, তাহার তিন ভাগের দুই ভাগই নষ্ট। আরেক ভাগ যাহা আছে তাহাও লক্কড়-ঝক্কড়।

এই যে পুলিশের জনবল, গাড়ি সমস্যা, পুরাতন গাড়ি মেরামত কিংবা গাড়ি চালাইবার জন্য যেইটুকু তেল দেওয়া হয়—এইগুলি কম না বেশি—তাহা দেখিবার জন্য কেহ কি আছেন? যেই দুই-একটা গাড়ি দেওয়া হয় উপজেলা পর্যায়ে, তাহা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সর্বত্র চলাচল করিতে পারে কি না—তাহা দেখিবারও কি কেহ আছেন? এই সকল সমস্যা লইয়া চিন্তা করিবার কি আছেন কেহ? উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের পুলিশের সবেধন নীলমণি একটা-দুইটা গাড়ি তাহারা কতখানি নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করিতে পারেন? মন্ত্রী বা ভিআইপিদের প্রটোকলে এই গাড়ি আটকা থাকিলে জরুরি প্রয়োজনে কী ব্যবস্থা হইবে—তাহা দেখিবার কি কেহ আছেন? নদীবহুল এলাকায় পুলিশের জন্য স্পিডবোট বা জলযান দেওয়া হয়। দেখা যায় যে, উহাকে সুরক্ষিতভাবে রাখিবার মতো জায়গার ব্যবস্থা করা হয় নাই। তাহার ফলে ঝড়ঝঞ্ঝায় সেই জলযান খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হইয়া যায়। ইহা মেরামতের অর্থ কে দিবেন? অনেক সময় এই সকল জলযান চালাইবার জন্য ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হয় না। এই যে জনবল ঘাটতি, জরাজীর্ণ গাড়ি, পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাব—ইহা কি আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের কাহারো জানা নাই? এত সমস্যার পরও যে বত্সরের অধিকাংশ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনোরকমে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়, তাহা সৃষ্টিকর্তার দয়া ছাড়া আর কী?

কী আশ্চর্য! দেশটা যেন সভা-সমিতি, বক্তৃতা আর গালভরা উপদেশের উপর ভর করিয়া চলিতেছে। লম্বা লম্বা কথা কিংবা উপদেশ দিতে কেহ কম যান না। এমনকি চোরেরাও চুরি না করিবার উপদেশ দিতে লজ্জা বোধ করেন না। চেয়ারে বসিলেই ইহাদের মুখের চোয়াল গরম হইয়া যায়, তখন তাহাদের মুখ দিয়া উপদেশের খই ফোটে। দুই দিনের বাছুরও তখন ছবক দেওয়ার ঔদ্ধত্য দেখান। তাহাদের বুকের পাটা যে এতখানি—তাহা দেখিয়া অবাক না হইয়া পারা যায় না। মনে রাখিতে হইবে, পৃথিবী আগাইয়া যাইতেছে, দেশও আগাইয়া যাইতেছে। মানুষকে আর বোকা বানাইয়া রাখা যাইবে না। বোকা মানুষের সংখ্যা কিছুদিন পর আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। সুতরাং কাজের কাজ করিতে হইবে। কাজ বেশি কথা কম।