‘নয়ন সমুখে তুমি নেই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’—দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কীভাবে চলে গেল। এবার তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন অজয় রায়। অজয় রায় ছিলেন বাংলাদেশের বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। নিজে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের সংখ্যাধিক গরিব-দুঃখী মানুষের দুর্দশা মোচনের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন সেই তরুণ বয়সেই। তিনি একটি মোটামুটি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন, এই জীবনকে তিনি উত্সর্গ করেছিলেন মানুষের জন্য। শোষণ, বৈষম্য এবং সব ধরনের নিপীড়নমুক্ত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সবার পেটে খাবার জুটবে, মাথার ওপর ছাদ থাকবে, পরনে কাপড় থাকবে, শিক্ষার সুযোগ থাকবে, রোগে উপযুক্ত চিকিত্সার ব্যবস্থা হবে, কাজ থাকবে—এমন একটি দেশের জন্যই তিনি ১৫ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, বছরের পর বছর কাটিয়েছেন আত্মগোপনে।
অজয় রায় ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তার মাতামহ মদন দত্ত আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। তার পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রামে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে অজয় রায় ছিলেন সবার বড়। তার বাবা ড. প্রমথ নাথ রায় ছিলেন ভারতের বানারসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি ভাষার অধ্যাপক। তিনি একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। মা কল্যাণী রায় ছিলেন গৃহবধূ। অজয় রায়ের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন বারানসিতেই শুরু। বারানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাশ করেন। বারানসিতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪৪ সালে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। এক বছরের ব্যবধানে মাও চলে যান। ফলে বাধ্য হয়ে অজয় রায়কে ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বনগ্রামে ফিরে আসতে হয়। সেখানে ঠাকুরদার তত্ত্বাবধানে ভাইবোনদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে নিজে ১৯৪৬ সালে ঢাকার মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে বিকম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে তিনি বিকম পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তার জেলজীবনও শুরু হয়। বিকম পাশ করে কিছুদিন একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পাকিস্তানের প্রায় পুরোটা সময় তার কেটেছে কারাগারে। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়েই তিনি অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাশ করেছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে ছিলেন; কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও ভেঙে যায়। এই ভাঙনে অজয় রায় পক্ষ নিলেন সংস্কারবাদীদের। নানা ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থিত হয়েছিলেন সামাজিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠনে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী একটি জাতীয় মঞ্চ গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা পালন করেছিলেন। অজয় রায় বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এরমধ্যে কয়েকটি বই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। শেষ দিকে রোগশয্যায় শুয়েও তিনি একটি বই লিখে গেছেন। রাজনীতি নয়—বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই ছিল অজয় রায়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২০টি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : বাঙলা ও বাঙালি, বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান, বাংলাদেশের ভূমিব্যবস্থার সংকট ও সমাধান, বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, রাজনীতির অ আ ক খ আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা, বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলন ইত্যাদি। তীরের অন্বেষায় নামে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলামও লিখতেন।
‘কমরেড’ অজয় রায়—এই তকমা তিনি মুছতে পারেননি। আবার অন্য পরিচয়ও তার ওপর বেশি আলো ফেলতে পারেনি। তবে এই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্যই ছিল তার জীবন উত্সর্গীকৃত। অজয় রায়কে অনেক ব্যাপারেই অনেকের মনে পড়বে। ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা দেশে অব্যাহতভাবে ঘটতে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদী সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন।
অজয় রায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লাখো শহিদের আত্মদানে অর্জিত স্বদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ হবে—এটা ছিল অজয় রায়ের বিশ্বাস এবং লক্ষ্য। প্রায় ৪৭ বছরের সংসার জীবনে অত্যন্ত কাছে থেকে তাকে দেখা ও বোঝার সুযোগ আমার হয়েছিল। মানুষের মঙ্গল চিন্তা ছাড়া তিনি আর কিছুই ভাবতেন না। এজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তার শেষ শয্যা পাতা হয়েছে বনগ্রামের মাটিতে। সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে। তার পৈতৃক বাড়ির কাছের একটি স্কুলের ১৪ জন দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে। প্রতি বছর তার জন্মদিন ৩০ ডিসেম্বর এই বৃত্তি প্রদান করা হয়।
অজয় রায়কে স্মরণ করতে গিয়ে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে নজর দিলে মনে প্রশ্ন জাগে, অজয় রায়েরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? একটি সুন্দর দেশ—সাম্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দের দেশই তো তার এবং তার মতো আরো আত্মত্যাগী রাজনীতিমনস্ক মানুষের মনে জাগ্রত ছিল। অথচ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের কালে অনেকের মনেই জিজ্ঞাসা—একটি মানবিক দেশ আমরা গড়ে তুলতে পারলাম না কেন? কোথায় ত্রুটি, কোথায় ব্যর্থতা? অজয় রায়কে যারা ভালোবাসেন, তাকে যারা শ্রদ্ধা করেন, তাদের আজ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করা, তাদের সামনে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া আজ জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
n লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
