বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃশংসতার চরমতম প্রকাশ। আর ঘৃণ্য নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড ছিল শিশু শেখ রাসেলের হত্যা। আজ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেলের জন্মদিন। আজ থেকে ৫৭ বছর আগে ১৯৬৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
বেঁচে থাকলে কত বড় হতেন শেখ রাসেল! শেখ হাসিনার লেখায় ছোটবেলার রাসেলকে পাওয়া যায়। যে রাসেল বুদ্ধিমান, আবেগপ্রবণ। কিন্তু অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ একটি শিশু। যে তার বাবাকে সারাক্ষণ খুঁজে ফেরে। যার ছোট ছোট কাজে একজন বুদ্ধিদীপ্ত শিশুর পরিচয় মেলে। আজ তার ৫৮তম জন্মদিন প্রথমবারের মতো জাতীয়ভাবে দেশব্যাপী উদ্যাপন করা হবে ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে। এছাড়া, বাংলাদেশের দূতাবাসসমূহেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘শেখ রাসেল দীপ্ত জয়োল্লাস, অদম্য আত্মবিশ্বাস’। শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, দেশের শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্মের কাছে শেখ রাসেল এক ভালোবাসার নাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাসেল যদি বেঁচে থাকত, তা হলে হয়তো একজন মহানুভব, দূরদর্শী ও আদর্শ নেতা আজ আমরা পেতাম, যাকে নিয়ে দেশ ও জাতি গর্ব করতে পারত।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শেখ রাসেল। দুই কন্যা, তিন পুত্র। কন্যা দুজন বেঁচে আছেন। একজন শেখ হাসিনা, অন্যজন শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠতম শেখ রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা-মায়ের সঙ্গেই।
একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে, যিনি সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা-স্থপতি, সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার নজির পৃথিবীতে বিরল। সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রনেতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রতিহিংসাবশত বা অন্য কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিবাদে হত্যা কিংবা গুপ্তহত্যার ঘটনা একাধিক ঘটেছে। কিন্তু জাতির পিতাকে সপরিবার হত্যার ঘটনা বাংলাদেশেই ঘটেছে।
বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল তখন মাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, ১১ বছরের শিশু। তার চোখের সামনেই একে একে হত্যা করা হয়েছে বাবা, ভাই, ভাবিদের। অনেকের মৃতদেহ পেরিয়ে গিয়ে ছোট্ট রাসেলকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। রাসেল তখন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ রাসেলকে নিয়ে তার লেখায় প্রশ্ন রাখেন এই বলে যে, ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ঐ ছোট্ট বুকটা কি তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসেখেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল—কী কষ্টই না ও পেয়েছিল! ‘কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল? আমি কি কোনোদিন এই ‘কেন’র উত্তর পাব?’
১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটি আলোকিত করে জন্ম নেয় শেখ রাসেল। ব্রার্ট্রান্ড রাসেল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় লেখক ছিলেন। প্রিয় লেখকের নাম থেকেই বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব ছোট ছেলের নাম রাখেন রাসেল। রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উত্কণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুপু ও মেজো ফুপু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজো ফুপু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুপু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুপু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালোচুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল। ’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছোট রাসেলকে নিয়ে ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ স্মৃতিচারণমূলক বই লিখেছেন। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেল গেটে দেখা করার প্রসঙ্গ টেনে রাসেলের কথা লিখেছেন এভাবে—‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।’
শেখ হাসিনাকে ‘হাসুপা’ বলতেন রাসেল। শেখ রেহানাকে ‘আপা’। আর শেখ কামাল ও জামালকে বলতেন ‘ভাই’। সুযোগ পেলেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সফরে যেতেন শেখ রাসেল। জাপান থেকে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ আসে। জাপান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছিল। শরণার্থীদের সাহায্য করতে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দিয়েছিল আমাদের দেশের শিশুদের জন্য। জাপান বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তবে বিশেষভাবে শেখ রাসেলের কথা উল্লেখ করেছিল তারা। তারা সেই সফরে শেখ রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচি রেখেছিল। রাসেলের জন্য খুব আনন্দময় সফর ছিল সেটা।
দিবসটির কর্মসূচি : শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শহিদ শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ আজ সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্টে নিহত সব শহিদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। এছাড়াও ‘শেখ রাসেল দিবস’ উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এক আলোচনাসভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া, শিল্পকলা একাডেমি দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল ৯টায় একাডেমিতে স্থাপিত শেখ রাসেলের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। বেলা ১১টায় জাতীয় চিত্রশালা প্লাজায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
