বাংলাদেশ চাল রপ্তানির যুগে প্রবেশ করেছে কয়েক বছর আগে। এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশে কখনো কখনো চাল আমদানি করলেও রপ্তানির বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান বিদ্যমান। তবে বিদেশের বাজারে যে চাল রপ্তানি হচ্ছে তা মূলত সুগন্ধি চাল। বিদেশের যেখানে বাংলাদেশের নাগরিকরা অবস্থান করেন তাদের চাহিদামতো চিনিগুঁড়া, কালোজিরা, কাটারিভোগ ইত্যাদি জাতের চাল রপ্তানি করা হয়। বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশে এই সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়। তবে কোভিড-১৯-পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে চাল রপ্তানি বন্ধ আছে। বিদেশের বাজারে চাল রপ্তানির পরিমাণ কমবেশি ২০০০ মেট্রিক টন। কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তি ও আবিষ্কার এবং সম্প্রসারণ কর্মীদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আজ চাল রপ্তানি সম্ভব হয়েছে।
সুগন্ধি চালের উত্পাদন প্রধানত রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া জেলায় হয়। এই ধানের ফলন কম হলেও বাজারে দাম বেশি। তাছাড়া এই ধানের চাষে সার কম প্রয়োজন হয় এবং সেচ অনেকটাই বৃষ্টিনির্ভর বলে উত্পাদন খরচও কম। আবার কিছু কিছু এলাকা আছে সেখানে সুগন্ধি চাল উত্পাদনের জন্য বিখ্যাত। যেমন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আউলিয়াপুকুর এলাকায় কাটারিভোগ চালের যে উত্পাদন হয় তা অন্য যে কোনো এলাকার চেয়ে উন্নত মানের।
দেশে ধান উত্পাদনে বিশেষ সক্ষমতা অর্জনের কারণে সুগন্ধি চাল উত্পাদন করে বিদেশে রপ্তানির একটা বড় সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে রয়েছে নানা রকমের চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন দেশে চাল আমদানির ক্ষেত্রে নানা রকমের নীতি রয়েছে। উত্পাদিত চাল কতটা পরিবেশসম্মত, কীটনাশক বা সারের প্রভাব কতটুকু আর্সেনিক বা অন্য কোনো প্রভাব আছে কি না সেটা আমদানিকারকরা বিবেচনা করে। রপ্তানিকৃত চালের গ্রেডিং, প্যাকিং এবং অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা করা বিশেষভাবে প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকরভাবে প্যাকেজিং করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া উত্পাদনকালে জিএপি বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস হচ্ছে কি না সেটাও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যারা রপ্তানির জন্য চাল সংগ্রহ করেন তারা মূলত বাজার থেকে চাল কিনে রপ্তানি করে থাকেন, যেটা টেকসই রপ্তানির জন্য যথার্থ নয়। রপ্তানির সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হলে উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সর্টিং, গ্রেডিং, প্যাকেজিং এবং সঠিক লেবেলিংয়ের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
সুগন্ধি চালের ক্ষেত্রে পাকিস্তান, ভারত অনেক বড় বাজার দখল করে আছে। সেই বাজারে প্রবেশের জন্য কিংবা সেই বাজারে অবস্থান নিশ্চিত করতে ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব রয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের সুগন্ধি চালকে প্যাকেট করে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের পাঠানো হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদেশি অতিথিদের কাছে এই চাল পাঠানো প্রয়োজন। তা ছাড়া বাংলাদেশের ফুড ফেস্টিভাল করে দেশীয় চালকে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় করার চেষ্টাও করা যায়। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আউলিয়াপুকুর এলাকায় যদি অন্য জাতের চাষাবাদ শুরু হয়, তাহলে এই দেশীয় কাটারিভোগের জাতটি বিপন্ন হতে বাধ্য। অতএব সুগন্ধি জাতের জন্য স্থান সংরক্ষণও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দিনাজপুর নয়, সুগন্ধি চাল উত্পাদনের অন্যান্য এলাকাকেও নিরাপদ রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
তাছাড়া এই সব ধানকে জিআই পণ্য হিসেবেও নিবন্ধন করা গেলে বাজার মূল্য ভালো পাওয়া যাবে। নানা কারণেই চাল উত্পাদন আমাদের কৃষকের কাছে সব সময় লাভজনক হয় না। কিন্তু সুগন্ধি চাল উত্পাদন বেশ লাভজনক। আবার প্রতি বছর বিদেশ থেকেও সুগন্ধি চাল আমদানি করতে হয়। যদিও আমাদের উত্পাদনের যে সক্ষমতা আছে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের কাছে যেসব প্রযুক্তি আছে তা সঠিকভাবে কাজে লাগালে ধান উত্পাদনে আরো সফলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। দেশে জিংকসমৃদ্ধ ধান উত্পাদন হচ্ছে। এই ধানও বেশি করে উত্পাদন করে বিদেশে পাঠানো সম্ভব। ভিটামিনসমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস নিয়েও কাজ চলছে। এগুলোর মাধ্যমে চালের মূল্য সংযোজন করে তা দেশে বিদেশের বাজারে বিক্রি করার সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে সব ক্ষেত্রেই জীব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্যাপ নীতিমালাকে যথার্থভাবে অনুসরণ করা বিশেষ প্রয়োজন। যেসব এলাকায় রপ্তানির জন্য চাল উত্পাদন করা হবে, সেসব এলাকাকেও কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। সুগন্ধি চাল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এর উত্পাদন, বিপণন নিয়ে সরকারকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রপ্তানি বাড়ানোর জন্য প্রণোদনা দিতে হবে, গবেষণা ও সম্প্রসারণ জোরদার করতে হবে। আমরা খোরপোশের কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষির দিতে যাত্রা শুরু করেছি, সেক্ষেত্রে এই ক্ষেত্রটি পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়া উচিত হবে না।
n লেখক : উপস্থাপক, মাটি ও মানুষ, বাংলাদেশ টেলিভিশন
